
অনলাইন ডেস্ক: একসময় রেলপথে মালবাহী ওয়াগনে করে ভারত থেকে চাল, ভুট্টা, গম, পাথর, পেঁয়াজ, ছাইসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে এ আমদানি কমে গেছে। চলতি অর্থবছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে আমদানি। ফলে কমেছে রাজস্ব আয়ও। ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা এলসি করতে না পারায় পণ্য আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ব্যাংকে শত ভাগ টাকা জমা দেওয়া কঠিন হচ্ছে ব্যবসায়ীদের জন্য। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এলসি খোলার পর ৩ থেকে ৪ দিন লাগছে পণ্য দেশে আসতে। ব্যাংক থেকে লোন নিলে সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। ডলার সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত ভারত থেকে পণ্য আমদানি সম্ভব নয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
রেলপথ দিয়ে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি সম্ভব না হলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বলেও জানান তারা। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ ও খরচ কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা রেলপথে পণ্য আমদানিতে আগ্রহ দেখাতেন। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলপথ দিয়ে মালবাহী ওয়াগনে করে ভারত থেকে নিয়মিত পণ্য আমদানি করতেন তারা। দ্রুত পণ্য আমদানি ও খালাসের পর নির্দিষ্ট স্থানে চাহিদামতো সরবরাহ সম্ভব হতো। অনেক ব্যবসায়ী আমদানি করা পণ্য নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ে খালাস করতেন। ডলার সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে এলসির মাধ্যমে তাদের চাহিদামতো পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। কিছু ব্যবসায়ী অল্প পরিসরে পণ্য আমদানি করলেও অনেকে দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। রেল ইয়ার্ডে কর্মব্যস্ততা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। মালবাহী ওয়াগন কম আসায় শ্রমিকরা অল্প সময়ে পণ্য খালাসের পর ট্রাকে লোড করছেন। কর্মহীন হয়ে পড়ছেন রেল ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকরা। ভাড়া না থাকায় ট্রাক মালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ট্রাকচালক ও হেল্পাররা এক রকম অলস সময় পার করছেন। নিয়মিত মালবাহী ট্রেন আসছে না দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনে।
বর্তমানে এ পথে পাথর আমদানি হচ্ছে ৪-৫ রেক। অথচ আগে প্রতি মাসে ২৫-৩০ রেক পাথর আমদানি হতো ভারত থেকে। দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলপথ দিয়ে গত ১০ মাসে পণ্য আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৬২ হাজার ৯৮৩ মেট্রিকটন। আর রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ভারত থেকে মালবাহী ওয়াগনে করে চাল, ভুট্টা, পাথর, পেঁয়াজ, চায়না ক্লে, ফ্লাই অ্যাশ, জিপসামসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৪২৭ রেক (মালবাহী ট্রেন) ১৭ হাজার ৭৩৬ ওয়াগন পণ্য আমদানি হয়েছে। আয় হয়েছে ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
গত বছরের জুলাই মাসে ৫৭ রেকে ২৩৭৮ ওয়াগনে ১ লাখ ৪১ হাজার ২৪৩ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ কোটি ২৯ লাখ ৭৭ হাজার ৬৮০ টাকা। আগস্ট মাসে ৬২ রেকে ২ হাজার ৫৫৮ ওয়াগনে ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৭৪ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৭ কোটি ২৪ লাখ ৮২ হাজার ২১৪ টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে ৫৫ রেকে ২ হাজার ২৮৯ ওয়াগনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪১ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৭ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৬ টাকা। অক্টোবর মাসে ৪১ রেকে ১ লাখ ৭৩৬ ওয়াগনে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৪ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৬৫ টাকা। নভেম্বর মাসে ৩৬ রেকে ১ হাজার ৫০১ ওয়াগনে ৮৮ হাজার ৯৫২ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখ ৬ হাজার ৬৩৩ টাকা। ডিসেম্বর মাসে ৪২ রেকে ১ হাজার ৭৭৮ ওয়াগনে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৫৫ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ৩ টাকা। জানুয়ারি মাসে ৩৭ রেকে ১ হাজার ৫৫৭ ওয়াগনে ৯০ হাজার ৬৮৩ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৪ কোটি ২৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬২ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪ রেকে ১ হাজার ৪৫৯ ওয়াগনে ৮৬ হাজার ৫২৩ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯১ টাকা। মার্চ মাসে ২৯ রেকে ১ হাজার ২৪৮ ওয়াগনে ৭৩ হাজার ৯১০ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৩২ হাজার ৯২১ টাকা। এপ্রিল মাসে ৩৪ রেকে ১ হাজার ২৩২ ওয়াগনে ৮৪ হাজার ৯০৮ মেট্রিকটন পণ্য আমদানি হয়েছে। রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ কোটি ৯২ লাখ ৭৩ হাজার ৭২৮ টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ৭০৯টি রেকে ৩২ হাজার ৪৭৪ ওয়াগন পণ্য আমদানি হয়। আয় হয় ৮৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে সব চেয়ে বেশি আমদানি হয় ৩৯২ রেক পাথর। এ ছাড়াও গম ১০৮ রেক, ভুট্টা ৭১ রেক, ছাই ৬১ রেক, চাল ৪০ রেক ও ৮ রেক পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়। মোট ৭০৯টি রেকে ৩২ হাজার ৪৭৪ ওয়াগন পণ্য আমদানি হয়। আয় হয় ৮৪ কোটি ৬৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
ট্রাকচালক খাইরুল বলেন, রোজার মাস থেকে পণ্য আমদানি নেই বললেই চলে। বেকার বসে আছি। এখন অল্প কিছু মাল আসছে। ট্রাক ভাড়া কম।
শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভারত থেকে মালামাল এলে কাজ থাকে। নয়তো অলস সময় পার করতে হয়। আগে প্রতিদিন ৫-৬ রেক মালামাল আসত। এখন কোনোদিন আসে, আবার কোনোদিন আসে না।
দর্শনা সিঅ্যান্ডএফের এজেন্টদের বন্দর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে মাসে ৫০-৬০ রেক মালামাল আসত। ডলার সংকটের কারণে এখন ২৫-৩০ রেক পণ্য আসছে। প্রতি এলসিতে শতভাগ টাকা জমা রাখতে হয়। ব্যাংকে ৩-৪ মাস টাকা পড়ে থাকে। পণ্য আসার পর বাজারদর হ্রাস পায়। সে ক্ষেত্রে লোকসান হয়। লোকসানের কারণে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছি। শতশত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, ডলার সংকট নিরসন করে ১০ শতাংশ মার্জিনে পণ্য আমদানির সুযোগ করে দেওয়া হোক।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেল স্টেশনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মির্জা কামরুল হক বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর রাজস্ব আয় হয়েছে অর্ধেক। মালামাল আমদানি অর্ধেক। এ কারণে রাজস্ব হ্রাস পেয়েছে। ভারত থেকে চাল, ভুট্টা, গম, পাথর, পেঁয়াজ, ছাইসহ বিভিন্ন পণ্য দেশে আমদানি হয়। রেলপথে পণ্য আমদানি করলে ব্যবসায়ীরা লাভবান হন। সহজে আমদানি ও খালাস করা সম্ভব হয়। খরচ তুলনামূলক কম। পণ্য আমদানি বাড়লে রাজস্ব আয় বেড়ে যাবে।
Leave a Reply