
অনলাইন ডেস্ক: নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর সমানভাবে পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। তবে রোজায় দায়িত্ব ও আমলের দিক থেকে নারীদের বিষয়টি পুরুষদের থেকে একটু আলাদা। ঘরোয়া পরিবেশে রমজানের পূর্ণাঙ্গ দাবি পূরণ, আল্লাহর কৃত ওয়াদার সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ও রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় তাদের সুযোগ পুরুষদের তুলনায় একটু বেশি। তাই রমজানের সঠিক পরিকল্পনা বা রুটিন করে নারীরা আমল করবেন। এ ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে নারীরা বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারেন।
ইবাদতে ভারসাম্য আনা : রমজানে প্রতিটি ইবাদতেই ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। রোজা হচ্ছে রমজানের প্রধান ইবাদত। তবে রোজার চেয়ে নামাজের গুরুত্বও কম নয়। রোজা রাখার ক্ষেত্রে মহিলারা এগিয়ে-এটা অবশ্যই খুশির কথা। অনেক মহিলা রোজা রাখে কিন্তু নামাজ পড়ে না। এটা খুবই অন্যায়। অন্য সময় তো নামাজ পড়বেই, রমজানে তা গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে। তা ছাড়া অন্যান্য ইবাদতের পরিমাণও বাড়িয়ে দিতে হবে। এমন যেন না হয় একটি ইবাদতই সারা দিন করলাম, অন্যান্য ইবাদত ছেড়ে দিলাম। বরং কিছু সময় নামাজ পড়া, কিছু সময় তসবিহ তাহলিল পড়া, কিছু সময় কুরআন তেলাওয়াত করা, কিছু সময় বিভিন্ন মাসআলার বই পড়া। এভাবে সব ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য থাকলে সব সুন্দরভাবে আদায় হবে।
বাক সংযম : অধিক বাকপ্রবণ বলে মহিলাদের পরিচিতি আছে। পরচর্চা, কুৎসা অনর্থক বিষয় নিয়ে মাতামাতি ইত্যাদি পরিহার করা। এসব রোজার জন্য খুবই ক্ষতিকর। না খেয়ে উপোস থাকা যেমন রোজার অংশ, তেমনি বাক সংযমও প্রয়োজন। জিহ্বাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে পেটকে শাস্তি দেওয়ায় কোনো কল্যাণ নেই। তাই রমজানে যথাসম্ভব বাক সংযম জরুরি।
পর্দা ও শালীনতা : নারীদের কখনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে হয়। ইসলাম তাদের পর্দা রক্ষা করে ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। রমজানে মহিলাদের বের হতে হলে এ বিধান বিশেষভাবে পালন করা জরুরি। অনেকেই রোজা রেখে খোলামেলাভাবে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। এটা তার রোজার পবিত্রতার জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি পরপুরুষের রোজা নষ্ট কিংবা হালকা করার জন্যও দায়ী। এ জন্য প্রয়োজনের তাগিদে বের হতে হলে শালীনভাবে বের হওয়া উচিত।
দান-সদকায় মনোযোগী হওয়া : অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় রমজানে দান-সদকার ফজিলত বেশি। এ মাসে নফল ইবাদতের দ্বারা সওয়াব অর্জনের ক্ষেত্রে দান-সদকার গুরুত্ব অনেক। এ কাজটি নারীদের দ্বারাই ভালোভাবে করা সম্ভব। সাংসারিক বিষয়াদি তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে তাদের বেশ সুযোগ রয়েছে। তাই রমজানে প্রত্যেক মহিলা গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর কৃপা কুড়াতে পারেন।
অহেতুক কাজ বর্জন : অনর্থক কাজ থেকে বেঁচে থাকার কথা বলা হয়েছে হাদিসে। রোজা রেখে অনেকের দিন কাটতে চায় না। এই অজুহাতে বিভিন্ন আজেবাজে কাজে সময় ব্যয় করে। কিন্তু এটা সমীচীন নয়। কেননা রোজাদারের সারা দিন ইবাদতের শামিল। বাহ্যিক কোনো ইবাদত না করলেও তার ধ্যান-ধারণা থাকবে ইবাদতের প্রতি। যথাযথভাবে রোজা আদায় ও এর পবিত্রতা রক্ষায় থাকবে সার্বক্ষণিক প্রয়াস। সময় কাটানোর কথা বলে গল্প-গুজব করে কিংবা অহেতুক কাজে যেন মূল্যবান সময় ব্যয় না হয়।
সন্তান ও অধীনস্থদের খোঁজ নেওয়া : অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে খুবই ধার্মিক। কিন্তু তার পরিবারের অন্যরা, বিশেষত সন্তানরা ধর্মকর্মের ধার ধারে না। নিজে রোজা রাখে কিন্তু সন্তানরা রোজা রাখে না। পিতামাতা এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। সন্তান-সন্ততি ও অধীনস্থদের রোজা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং এর ব্যবস্থা করে দেওয়া পিতামাতার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব আঞ্জাম না দিলে জবাবদিহি করতে হবে। অনেক মা পড়ালেখা বা পরীক্ষার অজুহাতে কিংবা অতি দরদের কারণে সন্তানকে রোজা রাখতে নিষেধ করে। এটা মারাত্মক গুনাহ। এর ফলে সন্তানও জাহান্নামের পথে অগ্রসর হবে, মাতাপিতাও অগ্রসর হবে।
কুরআন তেলাওয়াত : রমজান হচ্ছে কুরআন নাজিলের মাস। এ মাসের সঙ্গে রয়েছে কুরআনের নিবিড় সম্পর্ক। নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন তেলাওয়াতের স্থান সর্ব শীর্ষে। রমজানে কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব আরও বেশি। যারা কুরআন পড়তে পারে না তারা এ মাসে কুরআন তেলাওয়াত শিখে নিতে পারেন। মহিলাদের কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে রমজানকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। প্রত্যেক মহিলার জন্য এ সুযোগ কাজে লাগানো চাই।
ঘরে তালিম চালু করা : ঘরোয়া পরিবেশে একত্রিত হয়ে দ্বীনি জ্ঞান হাসিলের জন্য রমজান মাস হচ্ছে উপযুক্ত সময়। এ মাসে সাংসারিক ঝামেলা কিছুটা কম থাকায় ইচ্ছা করলে ঘরের সবাইকে নিয়ে তালিমের ব্যবস্থা করা যায়। প্রতিবেশী মহিলাদের নিয়ে একটি মজলিস করে সবাই দ্বীনের প্রয়োজনীয় বিষয়াবলি শিখতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেহেশতি জেওর, আহকামুন নিসা, ফাজায়েলে আমল ইত্যাদি কিতাবের সহায়তা নেওয়া যায়।
অপচয় রোধ করা : রমজানে যত খুশি খরচ করো, তাতে কোনো বাধা নেই-এ ধরনের একটি কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত। এর ওপর ভিত্তি করে রমজানে খরচের মাত্রা অপচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। কিন্তু এটা ঠিক নয়। রমজানও অন্যান্য মাসের মতোই। এ মাসেও হিসাব করে চলা উচিত। ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে যে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা হয়ে থাকে তা রোধ করার ক্ষেত্রে নারীদের যত্নশীল হতে হবে।
রোজায় নারীদের জরুরি মাসআলা
রোজার বিধান পুরুষের জন্য যেমন ফরজ, তেমনি নারীর জন্যও। হাদিসে এসেছে, ‘যদি কোনো নারী ঠিকমতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে, পর্দার সঙ্গে নিজ ইজ্জত হেফাজতে রাখে, স্বামীর আনুগত্য থাকে, তা হলে সেই নারীর জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাতের আটটি দরজাই খোলা রাখবেন, ওই নারী যে দরজা দিয়ে খুশি, সেই দরজা দিয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন’ (তিরমিজি)। রমজানে নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইবাদতের বসন্তকালে নারীদের নিবেদিত মনোভাবের কারণেই সম্ভব হয় রোজাকে
যথাযথ উদযাপন করা। নিজের ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি ঘরের ব্যবস্থাপনা, রান্না-বান্না, সন্তানের যত্ন, কর্মস্থলে ব্যবস্থা-সব মিলিয়ে নারীর জন্য যথেষ্ট পরিশ্রমের মাস রমজান। তবে নারীদের বিষয়টি পুরুষদের মতো নয়। কিছু বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হয়, যা জেনে রাখা খুবই জরুরি।
অন্তঃসত্ত্বা নারীর রোজা : অন্তঃসত্ত্বা নারীকে যদি কোনো মুসলমান পরহেজগার অভিজ্ঞ ডাক্তার বলেন, রোজা রাখলে তার নিজের বা গর্ভের বাচ্চার প্রাণনাশের বা মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা হলে সেই নারী রোজা নাও রাখতে পারেন। পরে শুধু কাজা করে নিলেই হবে। (হেদায়া : ১/২২২)
স্তন্যদানকারিণীর রোজা : স্তন্যদানকারিণীর রোজার বিষয়টিও অনেকটাই অন্তঃসত্ত্বার রোজার মতো। অর্থাৎ স্তন্যদানকারিণী নিজে রোজা রাখলে যদি দুগ্ধপোষ্য শিশুর প্রাণনাশ বা অন্য কোনো মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তা হলে তিনি রোজা নাও রাখতে পারেন। তবে পরে কাজা করে নিতে হবে।
ওষুধ খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ করে রোজা : নারীদের পিরিয়ড হওয়াটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আল্লাহ তায়ালা তাদের এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। এতে তাদের কোনো দোষত্রুটি নেই। পিরিয়ড অবস্থায় নামাজ মাফ। আর রোজা পিরিয়ড অবস্থায় রাখা নিষেধ। তবে এ রোজা না রাখাতে তাদের কোনো গুনাহ নেই। তবে পরে তা কাজা করতে হয়। এ জন্য রমজান মাসে পিরিয়ড হলে তা নিয়ে মনোক্ষুণ্ন হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তবে কেউ যদি শুরু হওয়ার আগেই ওষুধ বড়ি খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রেখে রোজা রাখেন, তবে সে রোজা সহিহ হয়ে যাবে। ফলে তা আর পরে কাজা করতে হবে না। (ফাতওয়া শামি : ১/৫০৮; ফাতহুল কাদির : ১/১৪৫)
লিপস্টিক বা লিপজেল : রোজা অবস্থায় নারীরা লিপস্টিক বা লিপজেল ব্যবহার করতে পারবে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, যেন মুখে চলে না যায়। যদি মুখে চলে যায়, তবে রোজা মাকরুহ হবে। গলায় স্বাদ অনুভব হলে রোজা ভেঙে যাবে। (কিতাবুল ফাতাওয়া : ৩/৩৯৮)
তরকারির লবণ চাখা : নারীরা রান্না করার সময় তরকারির লবণ পরীক্ষা করার জন্য জিহ্বার মাধ্যমে তরকারির স্বাদ নিলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। (আল ফিকুল মুয়াসসার, বেহেশতি জেওর)
Leave a Reply