
অনলাইন ডেস্ক: মানুষের জীবন বিশেষ মূল্য বহন করে। পশুপাখির জীবনের মতো অনর্থক নয় মানুষের জীবন। মানুষের জীবন ও মৃত্যু দুটোই মূল্যবান এবং বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের জন্মের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক নিবিড়। মৃত্যু মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অমোঘ ও চিরন্তন ফয়সালা। পৃথিবীর আলো-বাতাসে যে মানুষই চোখ মেলেছে তারই মৃত্যু হয়েছে। অনাগত পৃথিবীতে যারাই আসবে সবাই মরবে। কেউ চিরকাল বেঁচে থাকতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘সকল জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং কেয়ামতের দিবসে অবশ্যই তোমাদের প্রতিফল দেওয়া হবে।
অতএব (পরকালের অনন্ত জীবনে) যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম আর পার্থিব জীবন তো ধোঁকার বস্তু ছাড়া কিছুই নয়’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)। আসলে এ জন্য পার্থিব জীবনে ‘হতাশা’ ও ‘আশাহীনতা’ শব্দগুলো আল্লাহর খাঁটি মুমিন বান্দার অভিধানেই থাকতে নেই। মুমিন বান্দার পার্থিব জীবন সম্পর্কে এটিই মহামানব রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সারকথা।
এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন ও বিশ্বাসী বান্দার অবস্থা দেখে আমি বিস্মিত হই! প্রত্যেকটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া এই বৈশিষ্ট্য আর কেউই লাভ করতে পারে না। বিষয়টি হচ্ছে-মুমিন ও বিশ্বাসী বান্দা সুখ-শান্তিতে আল্লাহর শোকর আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণকর হয়। তেমনি বিপদ-আপদে মুমিন ধৈর্য ধারণ করে, যা তার জন্য কল্যাণকর হয়’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)। বর্ণিত হাদিসে সুখ-শান্তি ও বিপদ-আপদ উভয় অবস্থাই মুমিনের জন্য কল্যাণের হয়ে ওঠে এভাবে যে, সুখ-শান্তি পেলে মুমিন আল্লাহর শোকর আদায় করে আর শোকর আদায় করা নেকির কাজ এবং আরও বেশি নেয়ামত লাভের কারণ। শোকরের ফলে তার আমলনামায় সওয়াব জমা হয়। আবার জীবনে কখনো দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত হলে মুমিন ধৈর্য ধারণ করে। ফলে আল্লাহর কাছে মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি হতে থাকে এবং সবরের ফলে তার আমলনামায় সওয়াব জমা হয়।
মুমিন বান্দার হায়াত ও জীবন যেমন কল্যাণকর, তেমনি মউত ও মৃত্যুও কল্যাণকর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত বোলো না, তারা তো বরং জীবিত, তবে তোমরা তা অনুধাবন করতে পারো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৪)। আবার আপনজনের মৃত্যু মুমিন বান্দা-বান্দির জন্য সাময়িক মনোকষ্টের কারণ হলেও মৃত্যু মূলত তার জন্য রহমতস্বরূপ। কেননা মৃত্যু না হলে একজন মুমিন ও বিশ^াসী মানুষ কখনো জান্নাত ও জান্নাতি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করতে পারে না। তাই বরং মৃত্যুই মুমিনের জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র বাধা। এক হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘প্রতি ফরজ নামাজের শেষে যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, মৃত্যু ছাড়া তার সামনে জান্নাতে যেতে আর কোনো বাধা থাকবে না।’ (বুলুগুল মারাম, হাদিস : ৩০৬)
তবে একটি বিষয়, এমন অনেক দেখা যায় যে, অনেক অমুসলিম ও অবিশ^াসী পার্থিব জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি ও বিত্তবৈভবে জীবন কাটাচ্ছে। পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস পোষণকারী ও অমুসলিমদের সম্পদের প্রাচুর্য ও বৈষয়িক উন্নতি দেখে মুমিনের বিভ্রান্ত হওয়া একেবারেই উচিত নয়। অমুসলিমদের বৈষয়িক উন্নতি এখনকার যুগে নতুন কিছু নয়। এটি বহু আগে থেকেই ঘটে আসছে। বিষয়টি আরেকভাবে বললে বলা যায় সামান্য সময়ের পৃথিবীতে অমুসলিমদের জাগতিক উন্নতি আল্লাহ তায়ালারই সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা শুধু পার্থিব জীবন এবং তার জাঁকজমকতা কামনা করে, আমি তাদের কৃতকর্মের ফল দুনিয়াতেই মিটিয়ে দিই এবং এতে তাদের কোনো কমতি করা হয় না’ (সুরা হুদ, আয়াত : ১৫)। উল্লেখ্য, দুনিয়াবি সুখ-শান্তি এবং উন্নতি আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়ার লক্ষণ তো নয়-ই বরং অমুসলিমদের জন্য আখেরাতে কোনো প্রতিদান নেই বলে দুনিয়াতেই আল্লাহ তাদের জীবনকে আরাম-আয়েশ আর বিত্তবৈভবে ভরপুর করে দেন।
কিন্তু মুমিনের ব্যাপারটি এমন নয়। দুনিয়াতে সামান্য কিছুদিন কষ্টের বদলা হিসেবে আখেরাতে তার জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি আর ভোগবিলাসের সুব্যবস্থা। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় হচ্ছে-এই পৃথিবীর বুকে আল্লাহর কাছে মুহাম্মাদ (সা.)-এর চেয়ে প্রিয় না কেউ এসেছে আর না কেয়ামত অবধি কেউ আসবে। অথচ সেই মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর জীবদ্দশার অনেক ক্ষেত্রে অনাহারে কাটিয়েছেন। ক্ষুধায় কাতর হয়েছেন। খন্দকের যুদ্ধকালীন ক্ষুধায় তিনি পেটে পাথরও বেঁধেছেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমার রব আমার কাছে মক্কার কঙ্করময় বিস্তীর্ণ প্রান্তর স্বর্ণে পরিণত করে দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছিলেন। কিন্তু আমি বলেছি, হে আমার রব! আমার তার প্রয়োজন নেই। বরং আমি একদিন তৃপ্তির সঙ্গে খাব আর একদিন ক্ষুধার্ত কাটাব’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৭)। সুতরাং পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি মুমিনের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্তি জুটলে শোকরের মাধ্যমে সওয়াবের অধিকারী হওয়া এবং অপ্রাপ্তি জুটলে সবরের মাধ্যমে সওয়াবের অধিকারী হওয়া, যা আখেরাতের অনন্ত জীবনের প্রাপ্তি হবে।
Leave a Reply