
অনলাইন ডেস্ক: আরবিতে ‘নিফাক’ অর্থাৎ কপটতা দোষে দুষ্ট মানুষকে মুনাফেক বলা হয়। মুনাফেক অর্থ কপট বা দ্বিমুখী স্বভাবের মানুষ। মুখে এক রকম এবং কাজে আরেক রকম ভাব পোষণ করা। মুনাফেকরা মানুষের সামনে এক ধরনের এবং পেছনে আরেক ধরনের আচরণ করে থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘চারটি স্বভাব এমন, যার সবই কারও মধ্যে থাকলে সে পুরোদস্তুর মুনাফেক আর যার মধ্যে তার কোনো একটি থাকবে, সে যতক্ষণ তা পরিত্যাগ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফেকির একটি স্বভাবই থাকবে। স্বভাব চারটি হচ্ছে-১. যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে তাতে খেয়ানত করে, ২. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ৩. যখন কোনো ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং ৪. যখন কারও সঙ্গে ঝগড়া করে গালাগাল করে (বুখারি : ২৬৮২; মুসলিম : ৫৯)। এসব স্বভাব কারও মধ্যে থেকে থাকলে অবশ্যই বর্জন করতে হবে।
আমানতের খেয়ানত করা
কারও কাছে কোনো অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত রাখার নাম আমানত। যিনি গচ্ছিত সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেন এবং এর প্রকৃত মালিক চাওয়ামাত্র তা অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, তিনি আমানতদার। আর গচ্ছিত সম্পদ যথাযথভাবে মালিকের কাছে ফেরত না দিয়ে আত্মসাৎ করা আমানতের খেয়ানত। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন, যে তোমরা আমানত তার মালিককে ফেরত দেবে’ (সুরা নিসা : ৫৮)। আমানতের খেয়ানত প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, সে মুমিন মুসলমান নয়’। (মুসনাদে আহমাদ : ১১৯৩৫)
ওয়াদা দিয়ে ভঙ্গ করা
কারও সঙ্গে কেউ কোনো অঙ্গীকার করলে, কাউকে কোনো কথা দিলে বা লিখিত চুক্তি করলে তা পালন করার নাম ওয়াদা। যাপিত জীবনে মানুষ মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন রকম ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। এই ওয়াদা পালন করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও ঈমানের অঙ্গ। ইসলামে ওয়াদা ভঙ্গকারীকে মুনাফেকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে-যাদের জন্য পরকালে রয়েছে কঠোর শাস্তি। ওয়াদা ভঙ্গ করা মারাত্মক অপরাধ। ওয়াদা পালনের প্রতি জোরালো তাগিদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং তোমরা ওয়াদা পালন করবে, ওয়াদা সম্পর্কে তোমাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৪)। ওয়াদা রক্ষা করার সামর্থ্য থাকলে এবং তা পালন করতে ধর্মীয় কোনো বাধা না থাকলে যেকোনো মূল্যে তা রক্ষা করা ওয়াজিব।
কথায় কথায় মিথ্যা বলা
কুরআন ও হাদিসে মিথ্যাবাদীর ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। একটি মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য হাজারো ছলচাতুরী এবং আরও অনেক মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয়। এরপরও মিথ্যা কখনো সত্য হয় না। মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যায়। যারা মিথ্যাচার করে বেড়ায় তারা সংসারে, সমাজে এবং দেশে মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে। মিথ্যাবাদীর পাল্লায় পড়ে অনেক নিরীহ মানুষ প্রতারিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ বর্ষণ হয়। মিথ্যা বলে কেনাবেচাকারীর সঙ্গে বিচার দিবসে আল্লাহ কথা বলবেন না। হাসি-রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থা মিথ্যা সর্বাবস্থায়ই হারাম ও অবৈধ। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ এটা বাচ্চাদের অন্তরে গেঁথে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শনগুলোর ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যাবাদী।’ (সুরা নাহাল : ১০৫)
ঝগড়া বাধলে গালাগাল করা
যাপিত জীবনে কত রকম মানুষের সঙ্গেই মেলামেশা ও লেনদেন করতে হয়। এতে কখনো কখনো মতের অমিল দেখা দেয় এবং মাঝেমধ্যে তা কলহ-বিবাদ পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন কোনো অবস্থাতেই মুখ খারাপ করতে পারে না। সবসময় সে ভদ্রতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ব্যাপারে সচেতন থাকবে। দৃষ্টিভঙ্গিগত মতভেদ হোক, চিন্তা-চেতনার অমিল হোক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক বিরোধ হোক, কোনো অবস্থাতেই একজন মুমিন তার মুখ দিয়ে মন্দবাক্য উচ্চারণ করবে না। হাদিসের দৃষ্টিতে এরূপ করাটা মুনাফেকের আলামত।
মুনাফেকের পরিণাম
মুনাফেকদের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। পৃথিবীতে তারা সর্বদা অশান্তি ও মর্মপীড়ায় ভুগতে থাকবে এবং পরকালেও অনন্তকালের জন্য জাহান্নামের আগুনে শাস্তি ভোগ করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফেকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করবে’ (সুরা নিসা : ১৪৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, মুনাফেক পুরুষ, মুনাফেক নারী এবং কাফেরদের জন্য রয়েছে দোজখের আগুন।
তাতে তারা চিরদিন থাকবে। সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আজাব’ (সুরা মুনাফেকুন : ৬৮)। অতএব ঈমানদার হতে হলে এবং আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের অবশ্যই মুনাফেকি স্বভাব পরিত্যাগ করতে হবে।
Leave a Reply