
অনলাইন ডেস্ক: বছর ঘুরে আবারও আসছে নতুন বাজেট। আগামী ১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে। এটি হবে বাংলাদেশের ৫২তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের ২৩তম।
বাজেটটি হবে সর্বকালের সবচেয়ে বড় রেকর্ডের। বাজেটের আকার হবে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার। টানা পঞ্চমবারের মতো বৃহস্পতিবার বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এর আগে গত ১০ বছর টানা বাজেট দিয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
আসন্ন নতুন বাজেটের আকার কেমন হবে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হবে, ভর্তুকি কত থাকবে, কর কাঠামো কেমন হবে-তার সবই প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এক কথায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পেশের জন্য প্রায় প্রস্তুত। এখন শুধু শেষ সময়ের সংযোজন-বিয়োজন চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে এবারের বাজেটে সরকারের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ইতিমধ্যেই এ ধরনের মন্তব্যও করেছেন। তবে এবারের বাজেটে ব্যয়ের চেয়ে আয়ের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সে জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর কাঠামোকে একেবারে ঢেলে সাজাচ্ছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে রেখেই নতুন বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। তবে এ বাজেটে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া দরকার বলে অর্থনীতিবিদদের মত।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সময়ের আলোকে বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে ভোগ্যপণ্যের মূল্য এত পরিমাণে বেড়েছে যে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব কিছুটা রয়েছে, তবে দেশের ব্যবসায়ীরা এটিকে অজুহাত হিসেবে আরও বাড়িয়েছে। এর ফলে দেশে খাদ্যমূল্য স্ফীতি কিংবা খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি-উভয়ই এখন অনেক বেশি। তাই নতুন বাজেটে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে কীভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যায় সে দিকে জোর দিতে হবে।
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হচ্ছে-এক দিকে গত মহামারি করোনার কারণে নিম্ন আয়ের খেটে-খাওয়া অনেক মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। আবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব গরিব মানুষ কম খেয়ে জীবনধারণ করছে। মূল্যস্ফীতির কারণেও অনেক মানুষ দরিদ্র হয়েছে। সুতরাং নতুন বাজেটে গরিবদের সহায়তার জন্য সামাজিক কর্মসূচির দিকেও জোর দিতে হবে। সামাজিক কর্মসূচির সুবিধাভোগী ও অর্থের পরিমাণ-উভয়ই বাড়াতে হবে নতুন বাজেটে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, নানা কারণে এবারের বাজেট সরকারের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়া বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে বিভিন্ন রকম। এর পাশাপাশি এটি নির্বাচনের বছরের বাজেট। তাই সব দিক মাথায় রেখেই সরকারকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করতে হবে। তবে আমি বলব-সরকারের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার ভোগ্যপণ্যের মূল্য কমানোর পদক্ষেপে। এর জন্য চিনি, ভোজ্য তেলসহ বেশ কিছু পণ্যের আমদানি শুল্কে ছাড় দেওয়া দরকার। মোদ্দাকথা হলো-দেশের মানুষ কষ্টে আছে। তাই এবারের বাজেটটি যেন হয় সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বাজেট।
আসন্ন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের কাঠামো কেমন হচ্ছে সেদিকে নজর দেওয়া যাক।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের আকার হবে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। এতে মোট আয়ের লক্ষ্য থাকবে ৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর কর ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং এনটিআর ধরা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার হবে ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার। নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ধরা হচ্ছে ৬ শতাংশ। বাজেটের আকার হবে জিডিপির ১৫.২ শতাংশ। বাজেটে জিডিপির ৩৩.৮ শতাংশ বিনিয়োগের প্রাক্কলন থাকছে। এবারের বাজেটে আয় বাড়াতে করকাঠামোতে থাকবে ব্যাপক পরিবর্তন। বাজেটে ন্যূনতম কর না দিলে মিলবে না ৩৮ সেবা। টিআইএন বাতিল বা স্থগিতের ব্যবস্থা থাকবে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের ২২.৯ শতাংশ এ দুটি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরের বাজেটে তা উল্লেখযোগ্য হারেই বাড়ছে। ভর্তুকি ও সুদের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিভিন্ন পণ্য ও সেবায়ও বরাদ্দ বাড়ছে। ফলে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকায়, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৯.৯ শতাংশ। সে তুলনায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে এটি ছিল জিডিপির ৯.৭ শতাংশ। ভর্তুকি সুদ পরিশোধ এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ফলে এ বছরের মূল বাজেটের তুলনায় নতুন অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়ছে মাত্র ৮ শতাংশ।
নতুন অর্থবছরের (২০২৩-২৪) বাজেটে এডিপিতে ২.৬৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১.৬৯ লাখ কোটি টাকা এবং বাকি ৯৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে বৈদেশিক সহায়তা থেকে। নতুন অর্থবছরের বাজেটের আকার জিডিপির ১৫.২ শতাংশ। জিডিপির ৩৩.৮ শতাংশ বিনিয়োগের প্রাক্কলন থাকছে এতে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রাক্কলন করা হয়েছে জিডিপির ২৭.৪ শতাংশ, সরকারি খাতে ৬.৪ শতাংশ।
এত বিপুল ভর্তুকির পরও আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে খুব বেশি সুখবর থাকছে না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হচ্ছে ৬ শতাংশ; যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ছিল ৫.৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত মার্চে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৩৩ শতাংশ এবং এক বছরের গড় মূল্যস্ফীতির হার ৮.৩৯ শতাংশ।
সরকারও এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে। এই কর্মসূচির আওতা আগামী অর্থবছরে আরও বাড়ানো হচ্ছে। যাতে অধিকসংখ্যক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ থাকছে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা ৭.৩৫ লাখ বাড়ানো হচ্ছে। এসব খাতে মাসিক ভাতার হারও বাড়ানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ তিন ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে বরাদ্দ থাকছে প্রায় ১.৩০ লাখ কোটি টাকা। এবারের মূল বাজেটে যার পরিমাণ ১.১৩ লাখ কোটি টাকা।
অন্যদিকে নতুন বাজেটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে। কারণ আগামী দিনগুলোয়ও মূল্যস্ফীতি বহাল থাকবে-এমনটি ধরে নেওয়া হয়েছে। ওই হিসাবে আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির হার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ৬ শতাংশ। সেখানে মূল্যস্ফীতি সহনীয় আনতে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, টিসিবির মাধ্যমে ১ কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিকটন খাদ্য বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও একটি টুলস হচ্ছে ঋণের সুদহার বাড়ানো। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে বলে অবহিত করা হয়।
এ ছাড়া ঋণের সুদ, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ছে, তা তুলে ধরা হয়। সার্বিকভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের সুদব্যয়ে বরাদ্দ থাকছে ১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর ভর্তুকিতে বরাদ্দ থাকছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা জের রয়েছে। বিপুল ভর্তুকির মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ থাকছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছর কৃষি খাতে ভর্তুকিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে যা ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সেখানে দেখানো হয় জিডিপির অনুপাতে মোট ব্যয় চলতি অর্থবছরের মতো একই থাকছে আগামী দিনে।
আয় বৃদ্ধিতে নজর বেশি
আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। আগামী অর্থবছর এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলে তা জিডিপির ১০ শতাংশ হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশেরও কম, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। ঋণের শর্ত হিসেবে আগামী অর্থবছর জিডিপির অনুপাতে ০.৫ শতাংশ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৪.৩০ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৮.৬ শতাংশ। এটি এবারের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৬.২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছর এনবিআরকে জিডিপির ৮.৩ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলেও, সাম্প্রতিকতম তথ্যে দেখা গেছে তা গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।
অন্যদিকে আগামী অর্থবছরে আয় না থাকলেও কর দিতে হবে ২ হাজার টাকা। তবে ধনীদের দেওয়া হচ্ছে ছাড়। আগামী বাজেটে করযোগ্য আয় না থাকলেও ন্যূনতম দুই হাজার টাকা আয়কর দিতে হবে। তবে বাজেটে ধনীদের ওপর করের বোঝা কমানোর প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী। এখন বিত্তশালীদের ৩ কোটি টাকা বেশি সম্পদ বা একাধিক গাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের গৃহ সম্পত্তি থাকলে সারচার্জ বা সম্পদ কর দিতে হয়। এটি বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আগের হারেই কর দিতে হবে। এতে ধনীদের কম আয়কর দিতে হবে। বাচ্চার কলম, গৃহিণীর অ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের ঘটিবাটি, টয়লেট টিস্যু-ফেসিয়াল টিস্যু, নিজের বা পরিবারের জন্য নতুন মোবাইল ফোন কেনা-সব খাতেই খরচ বাড়বে।
এ ছাড়া মোবাইল ফোন উৎপাদন পর্যায়ে ২ শতাংশ ভ্যাট বসানো হচ্ছে। বর্তমানে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। আর সংযোজন পর্যায়ে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। এ কারণে খুচরা পর্যায়ে মোবাইল ফোনের দাম বাড়তে পারে।
বিদেশ ভ্রমণ অথবা চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমনের খরচ বাড়বে। বাজেটে বিমান টিকেটের ওপর ভ্রমণ কর বাড়ানো হচ্ছে। আকাশপথে দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে ২০০ টাকা ভ্রমণ কর দিতে হবে, এতদিন দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ কর দিতে হতো না। বর্তমানে স্থলপথে বিদেশ গমনে ৫০০ টাকা ও নৌপথে ৮০০ টাকা কর বহাল রয়েছে, এটি বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করা হচ্ছে। আকাশপথে সার্কভুক্ত দেশ ভ্রমণে এক হাজার ২০০ টাকা কর আছে, এটি বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করা হচ্ছে।
ব্যাংক ডিপিএসে (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) কর রেয়াতের সীমা বাড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাংকে বেশি টাকা জমালে বেশি কর ছাড় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ৬০ হাজার টাকা (মাসিক পাঁচ হাজার) ডিপিএসে কর রেয়াত পাওয়া যায়, এটি বাড়িয়ে এক লাখ ২০ হাজার (মাসিক ১০ হাজার) টাকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভাড়া দিলে বাড়িওয়ালার রিটার্নের রসিদ দেখানো বাধ্যতামূলক হচ্ছে নতুন বাজেটে। নতুন খাতের মধ্যে একটি হলো সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো বাড়িওয়ালা যদি বাড়ি ভাড়া দেন, তা হলে তাকে চুক্তিনামার সঙ্গে রিটার্নের রসিদ দিতে হবে। তবে এই ভাড়াটে হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক ভাড়াটে। যেমন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ফার্ম, ব্যাংক এবং বীমাসহ যেকোনো প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের সোসাইটি, সমবায়, ট্রাস্ট, ফান্ড, ফাউন্ডেশন, এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক হিসাব খুললে এবং চালু রাখতে হলেও রিটার্নের রসিদ দেখাতে হবে। এ ছাড়া ভবন ও ভূমি লিজ নিতে চাইলেও রিটার্নের রসিদ লাগবে।
ন্যূনতম কর না দিলে মিলবে না ৩৮ সেবা
সরকারি-বেসরকারি ৩৮ ধরনের সেবা নেওয়া আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছর থেকে ৩৮ ধরনের সেবা নিতে করদাতাদের রিটার্ন জমার রসিদ দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়। আসছে বাজেটে এ বিধান আরও কঠোর করা হচ্ছে। করযোগ্য আয় থাকুক আর না-ই থাকুক, ন্যূনতম ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা কর দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। ন্যূনতম এ কর না দিলে মিলবে না সরকারি-বেসরকারি ৩৮ সেবা। আগামী ১ জুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। সেখানে এই প্রস্তাব দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত নয়। কারণ আয়কর অধ্যাদেশের সঙ্গে বিষয়টি সাংঘর্ষিক হবে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে নির্ধারিত ৩৮ ধরনের সেবার মধ্যে অন্যতম হলো ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ আবেদন; ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনলে; ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার ক্ষেত্রে; কোনো কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারধারী হলে; ব্যবসায় সমিতির সদস্য হলে; কারও সন্তান বা পোষ্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করলে; অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়া; উপজেলা, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। এনবিআর সূত্রে আরও জানা গেছে, করযোগ্য আয় থাকুক আর নাই-থাকুক, আগামী অর্থবছর থেকে ন্যূনতম ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা কর দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। ন্যূনতম কর না দিলে এসব সেবা মিলবে না।
এ ছাড়া আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সব ধরনের জ্বালানি তেল আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে। বর্তমানে এসব পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ আগাম কর দিতে হয়। বর্তমানে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলে আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ অগ্রিম আয়কর, আগাম ভ্যাট আছে। আগাম কর কমালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি খরচ কিছুটা কমবে। এ ছাড়া মোবাইল ফোনে ভ্যাট বাড়তে পারে। বিশেষ করে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের ওপর ভ্যাট বাড়তে পারে। ফলে মোবাইল ফোনের দামও বেড়ে যেতে পারে। টিআইএন বাতিল বা স্থগিতের সুযোগ আসছে আগামী বাজেটে। বর্তমানে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাতিল বা স্থগিত করার সুযোগ নেই। ১২ সংখ্যার টিআইএন থাকলে অবশ্যই বছর শেষে আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত জানিয়ে বার্ষিক রিটার্ন জমা দিতে হয়। আগামী বাজেটে করদাতাদের এ ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। টিআইএন বাতিল বা স্থগিত করার সুযোগ রাখার প্রস্তাব আসতে পারে নতুন বাজেটে। আগামী বাজেটে বাড়বে ভ্রমণ খরচ এবং করদাতা খুঁজবে এজেন্ট। কেননা আগামী অর্থবছর থেকে নতুন করদাতা খুঁজতে বেসরকারি এজেন্ট নিয়োগ দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ জন্য সংস্থাটি আয়কর অধ্যাদেশে নতুন একটি ধারা সংযোজন করবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ ঘোষণা দেওয়া হবে। বাজেটে এ ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে নতুন করদাতা চিহ্নিত করা ও তাদের রিটার্ন দেওয়ার কাজে সহায়তা করবে বেসরকারিভাবে নিয়োগ দেওয়া এজেন্টরা।
স্বস্তি মিলবে করমুক্ত আয়সীমায়
আগামী অর্থবছর থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়তে পারে। বর্তমানে বার্ষিক আয়ের প্রথম ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো কর দিতে হয় না। এটি বাড়িয়ে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হতে পারে। ফলে করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। তাদের খরচ কিছুটা কমবে। এ ছাড়া ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র কেনা হলে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দাখিলের বাধ্যবাধকতায় মিলতে পারে ছাড়। বর্তমানে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে রিটার্নের প্রমাণপত্র দেখাতে হয় না। এ ছাড়া বাড়ি-গাড়ি কেনায়ও খরচ বাড়বে। ছোট করদাতাদের জন্য ভালো খবর থাকলেও ধনীদের জন্য আগামী বাজেট হতে পারে ‘খারাপ’। কারণ ফ্ল্যাট-প্লট, দামি গাড়ি কেনায় খরচ বাড়তে পারে। ফ্ল্যাট-প্লট, গাড়ির ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। ফ্ল্যাট-প্লট নিবন্ধন করার সময় ক্রেতাকে নানা ধরনের কর দিতে হয়। যেমন গেইন ট্যাক্স, ভ্যাট, স্ট্যাম্প মাশুল, নিবন্ধন মাশুল এবং স্থানীয় সরকার কর। সব মিলিয়ে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ কর দিতে হয়। এই করহার বাড়ানো হতে পারে। সব মিলিয়ে করহার হতে পারে ১৫ শতাংশ। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply