
অনলাইন ডেস্ক: মহাসমারোহে রাজধানীসহ সারা দেশে মহাষ্টমী ও কুমারী পূজায় ঢল নেমেছিল ভক্তদের। শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমীতে রোববার সকাল থেকেই ভক্ত ও অনুসারীদের আগমনে মুখরিত হয় মন্দির-মণ্ডপ। মহাষ্টমীর পাশাপাশি অন্যতম ছিল কুমারী পূজা। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশনে এ পূজা আয়োজন করা হয়। এক কন্যাশিশুকে মাতৃরূপে পূজা করা হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও কুমারী পূজায় অংশ নিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের ঢল নামে।
রাজধানীর রামকৃষ্ণ মঠে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয় বিপুল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। সকাল ৬টা ১০ মিনিটে মহাষ্টমী পূজা শুরু হয়। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে হয় পুষ্পাঞ্জলি। বেলা ১১টায় শুরু হয় কুমারী পূজা। আজ সোমবার সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে মহানবমীর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা। সন্ধ্যায় আরতি।
অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস-এই পাঁচ উপকরণে দেওয়া হয় ‘কুমারী’ মায়ের পূজা। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চলে এই পূজা। অর্ঘ্য প্রদানের পর দেবীর গলায় পরানো হয়েছে পুষ্পমাল্য। পুষ্পাঞ্জলি এবং প্রসাদ বিতরণ হয়।
পূজার কার্যক্রম শেষে কুমারী মায়ের নাম জানান রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ। তিনি বলেন, এ বছর কুমারী মা হয়েছেন শতাক্ষী গোস্বামী। তার বাবার নাম শ্যামল গোস্বামী, মা রীতা গোস্বামী। রাজধানীর নবেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্লে গ্রুপের শিক্ষার্থী শতাক্ষী গোস্বামী। তার জন্ম ২০১৮ সালে।
স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, কুমারী-প্রতীকে মাতৃরূপে অবস্থিতা সর্বব্যাপী ঈশ্বরেরই মাতৃভাবের আরাধনা। কুমারীতে সমগ্র মাতৃজাতির শ্রেষ্ঠ শক্তি-পবিত্রতা, সৃজনী ও পালনী শক্তি, সব কল্যাণী শক্তি সূক্ষ্মরূপে বিরাজিতা। তাই কুমারী পূজা। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার বেলুড় মঠে কুমারী পূজা শুরু করেছিলেন। তখন থেকে প্রতি বছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে এই পূজা চলে আসছে। কুমারী পূজা দেখতে সকাল থেকেই রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে ভিড় করেছেন হাজার হাজার পুণ্যার্থী। দীর্ঘ লাইন ধরে প্রবেশ করতে হয়েছে এখানে। রয়েছে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। দুর্গাভক্তরা কুমারী মাকে আরাধনায় মণ্ডপের সামনে উলুধ্বনি দিয়েছেন। ঢাকের বাদ্য, শাঁখের ধ্বনিতে পুরো মঠ, মিশন এলাকায় ছড়িয়ে গিয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ।
সনাতনী ধর্ম অনুযায়ী, মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ ধরায় আসেন দশভূজা দেবী দুর্গা, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হয়। তার এই ‘আগমন ও প্রস্থানের’ মাঝে আশি^ন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত পাঁচ দিন চলে দুর্গোৎসব।
অষ্টমী ও নবমী শেষে মঙ্গলবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের। মহাষ্টমীর সকালে মণ্ডপে আসা ভক্তরা জানান, তারা দেবীর কাছে শান্তি প্রার্থনা করতে এসেছেন।
হিন্দু শাস্ত্রমতে,শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী বাপের বাড়ি বেড়াতে মর্ত্যলোকে আসছেন। অসুর শক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্র হন দেবতারা। অসুর শক্তির বিনাশে অনুভূত হলো এক মহাশক্তির আবির্ভাব। দেবতাদের তেজরশ্মি থেকে আবির্ভূত হলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। আবির্ভূত হওয়ার পর দেবী দুর্গা আসুরিক শক্তিকে বিনাশ করে ত্রি-ভুবন রক্ষা করেন। এ কারণে দুর্গা কখনো দুর্গতিনাশিনী, কখনো সংকটনাশিনী।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বছর মা দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে আগমন করেছেন। ঘোড়ায় চড়ে গমন (প্রস্থান) করবেন। দেবীর আগমন ও বিদায় একই বাহনে হলে তা অশুভ ইঙ্গিত। এতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ-শোক, হানাহানি-মারামারি বেড়ে যেতে পারে। তবে ৫ দিনের পূজার প্রার্থনা থাকবে সব অশুভের বিনাশ। আগামী ২৪ অক্টোবর মহাদশমীতে প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। দেশে এ বছর ৩২ হাজার ৪০৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
এদিকে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ সকল মণ্ডপে শুক্রবার সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে মহাষষ্ঠী ও সপ্তমী ও মহাষ্টমী পূজা। সকালে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ এবং সন্ধ্যায় বোধন আমন্ত্রণ ও অধিবাস এবং ষষ্ঠী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সঙ্গে ছিল পুষ্পাঞ্জলি, আরতি ও প্রসাদ বিতরণ। সকাল থেকেই চণ্ডিপাঠে মুখরিত ছিল দেশের সব মণ্ডপ। ঢাকের বাদ্য আর শঙ্খের ধ্বনিতে ভিন্ন মাত্রার যোগ হয়।
কালের অমোঘ নিয়মে আবার এসেছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ধূপের ধোঁয়া, ঢাকের বাদ্যি বয়ে আনে আনন্দময়ী মায়ের আগমনী বার্তা। মানব হৃদয়ে জাগিয়ে তুলে আনন্দ শিহরণ। পত্র-পল্লবে, পুষ্পে-ফলে শরতের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে শারদীয় উৎসবের আমেজ। ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, রমনা কালীমন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারের মণ্ডপের প্রবেশ মুখেই নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল আকৃতির তোরণ। বাহারি রঙের কাপড় দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এসব তোরণ। বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত তোরণ থেকে শুরু করে মণ্ডপ পর্যন্ত সাজানো হয়েছে নানা রঙের ঝালর বাতি দিয়ে। বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমাগুলোকে নানা সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার চকবাজার, শাঁখারী বাজার, তাঁতিবাজার, ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে মেলা বসছে।
Leave a Reply