
অনলাইন ডেস্ক: গাজীপুর, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ৫ সিটিতে নির্বাচন ইসির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জন্যও এটি অগ্নিপরীক্ষা। যদিও বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তারপরও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যদি বিএনপির বাইরের কোনো দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়, সে ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের বিপর্যয় না ঘটে। দলীয় সূত্র বলছে, টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকায় অনেক নেতাই গা ছাড়াভাব নিয়ে রয়েছেন। তাদের কাছে রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতার সাধ নেওয়াটাই বেশি জরুরি। এতে করে স্থানীয় নেতৃত্বে দেখা দিয়েছে চরম দ্বন্দ্ব। তাই এই মুহূর্তে গাজীপুর, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলটির জন্য অগ্নিপরীক্ষা। এ অবস্থায় ৫ সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে নড়েচড়ে বসছে আওয়ামী লীগ। এবারকার সিটি নির্বাচনে যারা সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত, পরিশ্রমী, এলাকায় জনপ্রিয়, তৃণমূলের কর্মী থেকে উঠে আসা নেতা ও যাদের কোনো নৈতিকস্খলন নেই- এমন প্রার্থীদেরই বেছে নিতে চায় দলটি।
সূত্র আরও জানায়, দক্ষ ও পরীক্ষিত প্রার্থীর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থীর বিষয়ে খোঁজখবর নিতে ইতিমধ্যে একাধিক টিমকে দায়িত্ব দিয়েছেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন শেখ হাসিনা। তিনি এবার পরিচ্ছন্ন ও জনপ্রিয় প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে অটল রয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু ভোটেই নৌকার প্রার্থীরা যাতে জিতে আসতে পারেন এবং দলকে যেন কোনো বেগ পেতে না হয়, সেটি মাথায় রেখেই প্রার্থী দেবেন ৫ সিটিতে। তিনি এবার কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। আওয়ামী লীগ চায়, সব দলের অংশগ্রহণে ৫ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হোক। ফলে দলটি পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের খুঁজছে। কারণ বিগত দিনে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র, ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরও অনেকে বিভিন্ন দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরেছেন। তাই এবার আর এমন কাউকে নৌকার টিকেট দেওয়া হবে না, যারা দলীয় মনোনয়ন পেয়েও হেরে যাবেন। কারণ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অত্যাসন্ন। এই নির্বাচনের হারা জেতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
অন্যদিকে গত ৯ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী লীগের সংগ্রহ করা ফরম আগামী ১২ এপ্রিল বিকাল ৪টা পর্যন্ত জমা দেওয়া যাবে। এরপর দলটির স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের এক সভা গণভবনে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভা থেকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। ইসি ঘোষিত তফসিল অনুসারে আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোটগ্রহণ হবে। খুলনা ও বরিশালে ভোট হবে আগামী ১২ জুন। আর ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেটে ভোটগ্রহণ হবে।
দলীয় সূত্র বলছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করার পর তাকে মেয়রের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সাধারণ ক্ষমার আওতায় পুনরায় দলে ফিরেছেন। তিনি মেয়র পদ পেতেও তৎপর। এখন গাজীপুরে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গীর হবেন, নাকি নতুন কেউ- এ নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের প্রভাবশালী একটি অংশ জাহাঙ্গীরকে পুনরায় মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে তৎপর রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খানকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে রয়েছেন অনেকে। আজমত উল্লা ২০১৩ সালে বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানের কাছে হেরে যান। এর পরেরবার জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। গত নির্বাচনে ৫ সিটির মধ্যে ৪টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেও সিলেটে স্বতন্ত্র হিসেবে ভোট করে জয়ী হন বিএনপির আরিফুল হক। বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে তিনি টানা দ্বিতীয়বার মেয়র হন। এবার সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাকে দেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা রয়েছে বেশি। তার প্রতি দলের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বিবেচনা আছে। প্রার্থী হতে কয়েক বছর ধরে তৎপর সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজও। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির আরিফুল হক এবারও স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে আওয়ামী লীগের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে। অন্যদিকে গত ৯ এপ্রিল গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি গণভবনের বাইরে এসে জানিয়েছেন, তাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। খুলনায় তালুকদার আবদুল খালেক একাধিকবার মেয়র হয়েছেন। সেখানে মনোনয়ন পেতে অন্য কোনো নেতার তেমন কোনো জোরালো তৎপরতা নেই। ফলে তিনি আবার মনোনয়ন পেতে পারেন। এ ছাড়া বর্তমান মেয়রদের মধ্যে মাঠের জরিপে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন বরিশালের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। সেখানে দলীয় কোন্দলও প্রকট। বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের সঙ্গে মেয়রের দ্বন্দ্ব বরিশালের সর্বস্তরে আলোচিত। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেনের (হিরণ) অনুসারীদের কেউ কেউ ভেতরে-ভেতরে সাদিক আবদুল্লাহর বিপক্ষে। এ ছাড়া সাদিক আবদুল্লাহর আপন চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাত মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। তার দলীয় পদ নেই। তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সময় তার ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন হত্যার শিকার হন। তবে পুরো বরিশাল বিভাগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রভাব রয়েছে বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর। ফলে তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহর সম্ভাবনাও রয়েছে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলেন, আগামী বছরের প্রথম ভাগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এতে করে বাকি রয়েছে আর মাত্র ৮ মাস। ফলে সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কোনো ঝুঁকি নেবে না। তবে দলীয় মনোনয়ন ঝুঁকিতে বর্তমান সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়রদের দু-একজন রয়েছেন। তাদের ভাবখানা এমন, নৌকার টিকেট পেলেই তাদের আর কেউ হারাতে পারবে না। কিন্তু সামনে যেহেতু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ। যারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের এড়িয়ে চলেন, নৌকা হলেই পাস করে যাবেন এমন মনোভাব পোষণ করেন, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না, এলাকায়ও কোনো যোগাযোগ রাখেন না তাদের সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন, নৌকার বিপক্ষে কাজ করেছেন তাদের মনোনয়নও অনিশ্চিত।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ সময়ের আলোকে বলেন, সামনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই ৫ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যোগ্যতা বিবেচনা করেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নেই, এলাকায় জনপ্রিয়তা রয়েছে, সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত, পরিশ্রমী ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী- এমন ব্যক্তিদেরই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। আর দল মনোনয়ন দিলে তাকে জয়ী করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করবেন। তবে আশা করি, এবারের সিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্ল্যাহ সময়ের আলোকে বলেন, দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড রয়েছে। ওই বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে সভা হবে। তিনি সৎ, যোগ্য ও দলের জন্য যারা নিবেদিত তাদেরকেই মনোনয়ন দেবেন। তবে যারা বিভিন্ন সময় নৌকার বিরোধিতা করেছেন, তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিটি নির্বাচনে যেভাবে দলীয় মনোয়ন দেওয়া হয়, এবারও একইভাবে দেওয়া হবে। তবে দলের জন্য যারা পরীক্ষিত তারাই মনোনয়ন পাবেন। আর বিএনপি বলছে, তারা নির্বাচনে আসবে না। তাদের এই সিদ্ধান্ত ভুল। ৫ সিটি নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ- এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা যে দাবি তুলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তা আর বাংলাদেশের মাটিতে হবে না। এটি এখন জাদুঘরে।
Leave a Reply