
অনলাইন ডেস্ক: দেশের বিভিন্ন জেলায় ধান ও গম ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক। বিশেষ করে কিছু জায়গায় ব্রি-২৮ ধান ব্লাস্টে আক্রান্ত হওয়ায় অধিকাংশই চিটা হয়ে গেছে। ফলে কৃষকরা বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে ‘খোরাকি’ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। শত শত কৃষকের ব্রি-২৮ ধানের জমির প্রায় ৯০ শতাংশ চিটা হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকের খরচও উঠছে না। কেউ কেউ ধান জমিতেই ফেলে রাখছেন। কেউ হয়তো গরুকে খাওয়ানোর জন্য কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
সময়ের আলোর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের রাজাপুর, শায়েস্তাপুর ও সুলতানপুর ইউনিয়নের কৈজুরি মাঠের অন্তত ১৫ হেক্টর গম ক্ষেতে দেখা দিয়েছে হুইট ব্লাস্ট রোগ। পাকা গম মনে হলেও বেশিরভাগ শিষে দানা নেই। শিষের সঙ্গে শুকিয়ে যাচ্ছে গাছও। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন গমচাষিরা। চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কৃষকদের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী বারি ৩৩ জাতের বীজ সরবরাহ করলেও তা ছিল চাহিদার তুলনায় কম। ফলে কৃষকরা বারি ২৮ ও ২৯-সহ বিভিন্ন পুরোনো জাতের বীজ বপন করেন। এসব পুরোনো জাতের বীজ বপন করায় বিক্ষিপ্তভাবে দেখা দিয়েছে হুইট ব্লাস্ট রোগ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজবাড়ী জেলায় এ বছর ১২ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে। কৃষকদের আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম বারি ৩৩ জাতের বীজ বপন করতে। কারণ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গম গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত বারি ৩৩ জাতটি ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। কিন্তু অনেক জায়গাতেই কৃষকরা আমাদের পরামর্শ না মেনে নিজেদের পছন্দমতো পুরোনো জাতের বীজ বপন করেন। ব্লাস্ট আক্রমণের শুরুতেই আমরা কৃষকদের নাটিভো জাতীয় ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছি। নাটিভো স্প্রে করে কিছু কিছু জায়গায় ব্লাস্ট প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। আবার কিছু কিছু জায়গায় সম্ভব হয়নি। যেসব মাঠে এরই মধ্যে ব্লাস্ট আক্রান্ত হয়ে গম পেকে গেছে, সেসব গম কেটে ফেলার জন্য আমরা পরামর্শ দিয়েছি। আর যেসব মাঠে গম কাঁচা আছে তাতে ব্যাপকহারে নাটিভো স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছি। গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলায় বোরো ধানে দেখা দিয়েছে ব্লাস্ট রোগ। বিশেষ করে উফশী-২৮ জাতের ধানে এর প্রকোপ বেশি। রোগের প্রভাবে ধান চিটা হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
জানা গেছে, এ বছর জেলায় প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ৫৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর, উফশী জাতের ২২ হাজার ২০০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩০৭ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ধান নষ্ট হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আ. কাদের সরদার বলেন, বোরো-২৮ জাতের ধান গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যেসব জমিতে ব্লাস্ট রোগ হচ্ছে সেসব জমির ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। ব্লাস্ট রোগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কৃষকদের ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ নিরূপণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে সরকারের উচ্চমহলে পাঠানো হবে। সরকার প্রণোদনা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তা দেওয়া হবে।
আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার চিলমারীতে প্রায় প্রত্যেক জমিতে বিরি-২৮ জাতের ধানে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। উপজেলার ধরণীবাড়ীর কৃষক ইসমাইল হোসেন জানান, বেশ কিছু জমিতে বিরি-২৮ ধান লাগিয়েছি। প্রায় তিন বিঘা জমিতে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হয়েছে। ধানে শিষ বের হওয়ার পরপরই শিষের গোড়ায় পচন ধরে শিষ শুকিয়ে যাচ্ছে। চিটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কীটনাশক কিনে স্প্রে করার পরও ফল পাচ্ছি না। ধান কেটে গরুকে খাওয়াচ্ছি। চিলমারী উপজেলা কৃষি অফিসার প্রণয় বিষান দাস জানান, বিরি-২৮ একটি অতি পুরোনো জাত। গত বছর এ ধান না লাগাতে বারণ করে মাইকিং করা হয়। এর বিকল্প হিসেবে বিরি-৮৮, ৮৯ ও ৯০ জাতের ধান চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপরও অনেকেই অসচেতনভাবে এ ধান চাষ করেছেন। আক্রান্ত ক্ষেতে যথাযথভাবে কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি।
নওগাঁর মহাদেবপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মহাদেবপুর উপজেলার চলতি বোরো মৌসুমে বিভিন্ন মাঠে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত ক্ষেতের ধান প্রথমে হালকা হলুদ রং ধারণ করছে। দু-তিন দিনের মধ্যে ধান গাছ মরে যাচ্ছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মো. মোমরেজ আলী বলেন, উপজেলায় এবার বোরো ক্ষেতের রোগ বালাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবুও দু-একটি জায়গায় ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। কৃষকদের ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ছোট-বড় প্রায় সব হাওরের ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণ দেখা দিয়েছ। এ অবস্থায় ধানের ফলন কম হওয়ার আশঙ্কায় হতাশা কৃষকরা। ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আলী বলেন, জমিতে ব্লাস্ট রোগ দেখা দেওয়ার পরেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে পরামর্শ দেই। জমিতে ইউরিয়া প্রয়োগ, দিনে গরম ও রাতে ঠান্ডা আবহাওয়া ও অসময়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ায় এ রোগ হওয়ার মূল কারণ। বোরো ২৮ জাতের ধানে ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণ বেশি। প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ শনাক্ত করা গেলে দমন করা সম্ভব। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply