
অনলাইন ডেস্ক: অতীতে তিক্ত অভিজ্ঞতা হওয়ায় বিএনপি এবার সংলাপ নিয়ে আগ্রহী নয়। দলটির সিনিয়র নেতারা বলছেন, অর্থহীন সংলাপ হওয়ার চেয়ে না হওয়া ভালো। সংলাপ হয় দেশে-বিদেশে লোক দেখানো। সংলাপের পর উল্টো সমালোচনা হয়। সোমবার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে কোনো সংলাপ হবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার জবাবে বিএনপি বলছে, নির্দলীয় সরকার নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো সংলাপ নয়। দাবি আদায় না করে সংলাপ হবে অর্থহীন। তবে বিএনপির সমমনা শরিক দলগুলোর কেউ কেউ বলছেন, আন্দোলন ও সংলাপ সমানতালে চলতে পারে।
রাজনীতিতে সংলাপ বহুল পরিচিত ও সমাদৃত শব্দ। অনেক দিন পর তা আবারও আলোচনায় ফিরেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, সংলাপের সম্ভাবনা নেই। আর বিএনপির সঙ্গে তো প্রশ্নই আসে না। কারণ বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল। তাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে রায় দিয়েছেন কানাডার আদালত। এ ছাড়া বিএনপি দেশে অগ্নিসন্ত্রাস করে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, পশুর ট্রাকে আগুন দিয়েছে। তাদের দোসর জামায়াত। তাই তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়। ইতিমধ্যে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে কোনো দলের সঙ্গে সংলাপ হবে না। সে ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রশ্নই ওঠে না।
সংলাপ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হবে। এখানে কারও সঙ্গে সংলাপের দরকার নেই। যদি কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, সংবিধান অনুযায়ী অংশ নেবে।
দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, আমার জানামতে, এখন পর্যন্ত কোনো দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপের সিদ্ধান্ত নেই। এখন দলের কাউন্সিল নিয়ে সবাই ব্যস্ত। তবে নির্বাচনের আগে সংলাপ হতে পারে। সেটাও হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতক দলগুলোর সঙ্গে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়।
সোমবার এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আন্দোলনে জনগণের সাড়া না পেয়ে বিএনপি নেতারা প্রতিনিয়ত উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি কখনোই নিজেদের জনগণের আয়নায় দেখতে প্রস্তুত না। এ জন্য তারা সর্বদা জনমত যাচাইয়ের গণতান্ত্রিক পন্থা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। নির্বাচন আতঙ্ক থেকে তারা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের সুরে কথা বলছে ১৪ দলীয় জোটও। জোট শরিক ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, যেখানে আমাদের জোটপ্রধান সংলাপ নিয়ে পরিষ্কার করেছেন; সেখানে আমার কোনো বক্তব্য নেই।
তবে বিরোধী দল বিএনপিও সংলাপ চায় না। এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে দলটি। তারা বলছে, সংলাপ বহু হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। সংলাপের কোনো প্রতিশ্রুতিই সরকার রাখেনি। সংলাপ শুধু চা খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা কি সংলাপের কথা বলেছি। তা হলে সংলাপের প্রসঙ্গ আসবে কেন? স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আর কত সংলাপ। এখন কার্যকর করার পালা। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই নির্দলীয় সরকারের দাবি করে আসছি। এটি নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি ছাড়া কোনো সংলাপ নয়। সংলাপ তো ২০১৮ সালেও দেখেছি। কী লাভ হয়েছে? সেই আলাপের কথা তো আমরা ভুলে যাইনি। জনগণ দেখেছে গণভবনের সেই আলাপের মর্যাদা সরকার কতটুকু রেখেছে।
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, আমরা একদফা দাবিতেই আছি। নির্দলীয় সরকারের ফয়সালা না হলে সংলাপ নিয়ে কোনো আলোচনা নয়। আগে দাবি পূরণ হোক, পরেরটা পরে হবে। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সময়ের আলোকে বলেন, ২০১৮ সালে সংলাপের নামে জোর করে ডিনার খাইয়ে মুখ পুড়িয়েছিলেন। এবার আর নয়।
সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা একাধিকবার সরকারের সঙ্গে সংলাপ করেছি। ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণভবনে সংলাপ করেছি। কিন্তু এরপর সরকার সেখানেও চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ৩ মাস পর নতুন নির্বাচন দেওয়ার কথা বলে তারা প্রতারণা করেছে। সংলাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সত্যের অপলাপ বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
বিএনপির একজন সিনিয়র নেতার ভাষ্য, সরকার এখন নানামুখী চাপে আছে। আন্তর্জাতিক চাপ তো আগে থেকেই আছে। এখন নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। এসব চাপ সামাল দিতে তারা সংলাপের নামে নানা কথা বলছে। হয়তো কয়েক দিন পর আমন্ত্রণ জানাবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সংলাপকে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে। কারণ যুদ্ধের ময়দানেও আলোচনার দ্বার একেবারে বন্ধ করা উচিত নয়। আলোচনা-আন্দোলন উভয়ই চলতে পারে। কিন্তু আমার কাছে সংলাপ নিয়ে সংশয় আছে। কেননা আলাপ বেশিরভাগ সময় কথা চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারি বলেন, জটিলতা তৈরি হলে আলোচনার বিকল্প নেই। রাজনীতিতে সংলাপ খুবই প্রাসঙ্গিক। ১৯৯৬ সালে তাই হয়েছিল। কেননা রাজনীতিতে সংঘাত শুভ কিছু বয়ে আনবে না। আর বিদেশিরাও চাইবেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একটি সমঝোতায় পৌঁছাক সংলাপের মধ্য দিয়ে।
আর সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সংলাপ নিয়ে নিরাপদ বক্তব্য দিচ্ছে। পার্টির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটওয়ারী সময়ের আলোকে বলেন, সংলাপ রাজনীতে ভালো উপায়। তবে বিএনপি ১০ ডিসেম্বরে হার্ডলাইন ও তাদের এমপিদের পদত্যাগের মাধ্যমে সংলাপের বিষয়টি তিক্ত করেছে।
Leave a Reply