
জ. ই. আকাশ, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ :মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে আ. লীগ সরকারের শাসনামলের ১৫ বছরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর অঙ্গ সংগঠনের প্রায় সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দলটির উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপকালে তারা এসব অভিযোগ করেন। এ সব মামলার মধ্যে অধিকাংশ মামলাই বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনেই করা হয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা যায়।
জানা যায়, গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র- জনতার আন্দোলনের তোপের মুখে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আ. লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ ঘটনায় আত্মগোপন করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মী অনেকেই। পরবর্তীতে দেশ পরিচালনায় গত ৮ আগস্ট গঠন করা হয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার। এতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়েতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দলীয় কর্মকাণ্ড আবার নতুন রূপে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝেও প্রাণ ফিরে আসে। এর ফলে বিগত আ. লীগ সরকার শাসনামলে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানির বিষয়গুলো নিয়ে মুখ খুলেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয় উপজেলার বিএনপি’র দলীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী সরকারের শাসনামলের ১৫বছরে বিভিন্ন ইস্যুতে সারাদেশের ন্যায় এ উপজেলার প্রায় সহস্রাধিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এ ছাড়া আ. লীগের শাসনামলে দলীয় কোনো প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল মিটিং এমনকি দলীয় কমিটিগুলোও ঠিক মতো করতে পারেনি। দলীয় পদাধিকার অনেক নেতার নামেই ১০/১৫টিরও অধিক মামলা দেয়া হয়েছে বলেও জানা যায়। শুধু তাই নয়, এ উপজেলার নেতাকর্মীদের অন্য থানায়ও আসামী করে মামলা দেয়া হয়। এছাড়াও শুধু দলীয় নেতাকর্মীই নয়, পাশাপাশি খেটে খাওয়া অনেক নিরীহ মানুষদেরকেও বিএনপি’র দলীয় ট্যাগ লাগিয়ে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে আজিমনগর, সুতালড়ী ও লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে বিএনপিপন্থিদের জমিজমাসহ সাধারণ মানুষের জমিজমাও জবর দখল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ বিএনপি নেতাকর্মীদের।
এ বিষয়ো উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আবু সা’দাত মো. শাহীন মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন হয়েছে। ফ্যাসিবাদ সরকার থেকে এ দেশের জনগণ মুক্তি পেয়েছে। আমরা ১৫বছর বাকরুদ্ধ অবস্থায় কাটিয়েছি। সারাদেশে আমাদের কোনো নেতাকর্মী এতোদিন বাড়িতে ঘুমাতে পারেনি। আমাদের একেকজন নেতাকর্মীকে একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়েছে। শুধু হরিরামপুর থানায় নয়, সিংগাইর ও সদর থানায় আমাদের অনেকের নামে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। আমাদের নেত্রী, দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, “আমরা প্রতিহিংসা নয়, প্রতিশোধ নয়, আগামীর বাংলাদেশ হবে ভালোবাসার বাংলাদেশ।” যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি এটা আমাদের ধরে রাখতে হবে। এখানে আমরা আর কোনো সংখ্যালঘুকেও নির্যাতন হতে দেব না।”
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ
জানান, “ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা দ্বিতীয়বার দেশে স্বাধীনতা পেয়েছি। বাকরুদ্ধ অবস্থায় আমরা দীর্ঘ ১৫ বছরের পার করেছি। আমাদের নেতাকর্মীদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। কেউ ঠিকমতো রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারে নাই। আমরা দলীয় কার্যক্রমও করতে পারি নাই। ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই বিজয় সারা দেশবাসী মনে রাখবে। এখন আমাদের নেতাকর্মীদের মাঝে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফিরে এসেছে। আমাদের এই অর্জনকে ধরে রাখতে হবে।”
উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুস জানান, “দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ প্রশাসনের কারণে আমরা কোনো রাজনৈনিক কর্মকাণ্ড করতে পারি নাই। এমনকি আমাদের নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু দিবসও পালন করতে পারি নাই। আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। শুধু তাই নয়, দেশের সাধারণ মানুষও স্বাধীন মতো চলাফেরা করতে পারে নাই, কথা বলতে পারে নাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আজ দেশের মানুষ স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। দেশের মানুষের মাঝে শান্তি ফিরে এসেছে। আমরা চাই, বর্তমান অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে দেশের একটা সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে এনে একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক।”
উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান মৃধা জানান, গত ৫ আগস্ট কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র- জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতনে দ্বিতীয়বারের মতো এ দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয়েছে। দেশের মানুষ আজ প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। কথা বলতে পারছে। বিগত ১৭ বছর যাবৎ আমরা কোনো প্রকার দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারিনি। সারাদেশের মতো আমার হরিরামপুরেও আমাদের দলীয় শতশত নেতাকর্মীদেরকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ঘরবাড়ি ছাড়া করে রাখা হয়েছিল। আমরা কেউ শান্তিতে বাড়ি থাকতে পারিনি। বর্তমানে আওয়ামীপন্থি কিছু দুষ্কৃতকারী আমাদের দলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। এদের থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহর অশেষ রহমতে স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। আমরা এখন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। চলাফেরা করতে পারছি। স্বাধীন দেশে মানুষ যেন স্বাধীনভাবেই চলতে পারে, কথা বলতে পারে, আমরা সেই অধিকারই প্রতিষ্ঠা করতে চাই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ সকল ধর্মের মানুষ মিলেই প্রতিষ্ঠিত হোক সুখ,শান্তি ও সমৃদ্ধিতে আগামীর বাংলাদেশ।
তবে মামলার বিষয়ে অনুসন্ধানকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বিশেষ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হরিরামপুর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনে বিভিন্ন ধারায় করা মোট মামলার সংখ্যা ১২টি। এ সব মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ প্রায় দুই শতাধিক আসামি করা হয়েছে।
Leave a Reply