
অনলাইন ডেস্ক: বগুড়ার সান্তাহার একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। তা ছাড়া বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও নাটোর জেলা শহরের সংযোগস্থল হওয়ার কারণে পৌরসভাটির গুরুত্ব অনেক বেশি। ভৌগোলিক কারণে এই শহরে গড়ে উঠেছে ১১-১২টি কেপিআই প্রতিষ্ঠান।
গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও শহরের অধিকাংশ সড়কের অবস্থা বেহাল। বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে অনেক সড়ক। যার কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জনসাধারণকে। বছরের পর বছর ধরে সড়কের কোনো প্রকার সংস্কার না হওয়ায় সড়কগুলোর পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুয়েকটি সড়ক ছাড়া পৌরসভার সব সড়কই বর্তমানে চলাচলের অযোগ্য। তার ওপর কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিবন্দি হয়ে পড়েন পৌর এলাকার বাসিন্দারা, সৃষ্টি হয় অচলাবস্থার। নোংরা-পচা পানি ও ময়লা পার হয়ে যাতায়াত করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সান্তাহার রেলগেট থেকে সাইলো সড়ক পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়ক দিয়ে হার্ভে যাতায়াত করে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও আহসান উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী। পাশাপশি সান্তাহার ইউনিয়ন ও আদমদীঘি সদর ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করে ওই একই সড়ক দিয়ে। ভাঙাচোরা এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থায় পড়তে হয় শিক্ষার্থী ও মানুষজনকে।
হার্ভে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমানা জাহান জানায়, ‘গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সড়কের এই বেহাল অবস্থা। আমাদের অনেক কষ্টে এই সড়ক দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। আর বর্ষা এলে যে ভোগান্তি হয়, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শহরের সোনার বাংলা বিপণী বিতান সংলগ্ন রিকশা-ভ্যান স্ট্যান্ড থেকে যোগীপুকুর, সান্তাহার পৌরসভার জ্যোতির মোড় থেকে হবির মোড়, সান্তাহার-বশিপুর বাইপাস মোড় থেকে বশিপুর হিন্দুপাড়া, সাইলো সংযোগ সড়ক থেকে তারাপুর রেলগেট এবং নেসকো কার্যালয় মোড় থেকে দুর্লভবাবা মাজার হয়ে বশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বার্মা রোড থেকে তিয়রপাড়া পর্যন্ত সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে একেবারে। এ ছাড়া শহরের পূর্বশা সিনেমা হল সংলগ্ন ও সান্তাহার প্রেসক্লাবের পশ্চিম পাশের রেলওয়ে টিকেট ঘর বাইপাস সড়কে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।
মজিবুর রহমান নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘সান্তাহার-টিউরপাড়া সড়কটি ১৯৯৫ সালে সর্বশেষ স্থানীয় এক ঠিকাদার নির্মাণ করেন। সড়কটি জরুরিভিত্তিতে সংস্কার অথবা পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। এই সড়কের একটি বড় সেতুর অবস্থাও বেহাল দীর্ঘদিন ধরে। অথচ আমাদের সমস্যার দিকে ফিরেও তাকায় না কেউ।’
সান্তাহার-ইয়ার্ড কলোনির মধ্যে চলাচলকারী একমাত্র সড়কটিও বেহাল। সান্তাহার পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এ সড়কটি সান্তাহার রেলগেট থেকে শুরু করে সান্তাহার সাইলো সড়কে গিয়ে শেষ হয়েছে। এ সড়ক দিয়ে সান্তাহার হার্ভে স্কুল মোড়, ইয়ার্ড কলোনি, সান্দিড়া, করজবাড়ী, কদমা, রামপুড়ায় প্রতিদিন কয়েক হাজার পথচারী যাতায়াত করে। এ সড়কের মধ্যবর্তী সাইলো সড়কটিরও অবস্থা আরও করুণ। প্রতিনিয়ত বায়ু ও শব্দদূষণের মধ্যে চলাফেরা করতে হয় এখানকার হাজার হাজার পথচারীকে। কারণ এ সড়ক দিয়ে সান্তাহার সাইলোর কয়েক হাজার ভারী ট্রাক যাতায়াত করে থাকে।
ওই সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশা চালক জনি হোসেন বলেন, ‘উপজেলার কোথাও এত খারাপ সড়ক নেই। অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমাদের এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয়।’
আদমদীঘি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সান্তাহার ইউনিয়নের দমদমা গ্রামের বাসিন্দা সাজেদুল ইসলাম চম্পা বলেন, ‘আমরা ইউনিয়নে বসবাস করলেও সান্তাহার পৌরসভার চেয়ে আমাদের ইউনিয়নের সড়ক অনেক ভালো। বাংলাদেশের কোনো পৌরসভায় এত দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক সংস্কারবিহীন অবস্থায় আছে বলে আমার মনে হয় না।’
এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় সান্তাহার পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিমকে। এ সময় তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের জন্য গত অর্থবছরে এলজিইডিতে প্রকল্প পাঠানো হয়েছিল কিন্তু কোনো অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।’
গত মেয়র নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী ও বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আশরাফুল ইসলাম মন্টু বলেন, ‘চলতি মেয়াদে সান্তাহারের সড়কগুলোতে কোনো ধরনের সংস্কার কিংবা নতুন সড়কের কাজ হয়নি। অথচ আমাদের বর্তমান মেয়র টানা তিন মেয়াদ ধরে পৌরসভার দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন। জনসাধারণ পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছেন। আমি আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধান করব, ইনশাআল্লাহ।’
সান্তাহার নাগরিক কমিটির সভাপতি ও সান্তাহার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোসলেম উদ্দিম বলেন, ‘পৌরসভার দায়িত্ব নাগরিকদের সেবা প্রদান করা। নাগরিকরা যদি সেবা না পায় এটি দুঃখজনক। সান্তাহার পৌরসভায় অবস্থিত সব সড়কই চলাচলের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আমরা মেয়রকে বিষয়টি একাধিকবার জানিয়েছি। তারপরও কেন যে সড়কগুলোর কাজ হচ্ছে না, বুঝতে পারছি না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয় সান্তাহার পৌরসভার টানা তিনবারের মেয়র তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টুর কাছে। তিনি বলেন, ‘গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়। তবে ওই প্রকল্প প্রস্তাব আবারও প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। অর্থ পাওয়া গেলে দ্রুত সড়কের সংস্কার করা হবে।’
আর প্যানেল মেয়র জার্জিস আলম রতন বলেন, ‘এসব সড়কের বেশিরভাগ স্থানীয় সরকার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু অর্থ ছাড় না করায় দরপত্র আহ্বান করা যাচ্ছে না।’ সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply