
অনলাইন ডেস্ক: দখল, দূষণ, আর বছরের পর বছর খনন কার্যক্রম না থাকায় পলি জমে ভরাট হয়ে পরায় চলনবিলের ১৬ নদ-নদীসহ এ এলাকার অধিকাংশ খাল বিল আজ অস্তিত্ব সংকটে। এক সময় বছরের অধিকাংশ সময় চলনবিলের নদী খাল বিলগুলোতে পানি থাকলেও এখন পৌষে এসেই শুকিয়ে যায়। প্রায় ৬ মাস নদী খাল বিলগুলো থাকছে পানি শূণ্য। ফলে মাছের উৎপাদন যেমন কমছে তেমনি শস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিলের কৃষক মুখোমুখি হচ্ছেন সেচ সংকটের। ব্যহত হচ্ছে নৌ চলাচল। নৌপথের নাব্যতা সংকটের কারণে অধিক খরচে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পরছে ব্যবসা বাণিজ্যে। এ এলাকার খাল বিল নদী নালা হারাচ্ছে স্বকীয়তা। পানি শূন্য নদীর বুকে চলছে ধানসহ অন্যান্য ফসলের চাষ।
অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হামিদ রচিত চলনবিলের ইতিকথা গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, জলপাইগুড়ির পাহাড় থেকে উৎপন্ন হওয়া আত্রাই ও গুর নদী রাজশাহীতে এসে কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পরে। এর একটি শাখা কয়রাবাড়ি, নন্দনালী, ও আত্রাই হয়ে আত্রাই ঘাটের এক মাইল নিম্ন হতে ‘গুড়’ নামে সিংড়া, একান্ন বিঘা, যোগেন্দ্রনগর ও কালাকান্দরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁচকৈড় ত্রীমোহনায় নন্দ কুজার সাথে মিশেছে। গুমানী নামে নদীর পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে নূরনগরে বড়াল নদীর সাথে মিশেছে। ১৭৮৭ সালে তিস্তার সাথে আত্রাই নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। জলপাইগুড়ির উত্তর পশ্চিম সীমান্ত থেকে দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ নিমগাছী তাড়াশ, চাটমোহরের হান্ডিয়াল হয়ে অষ্টমনিষার কাছে বড়াল নদীতে মিশেছে। ১৩০৪ সালে ভূমিকম্পে নদীটির কয়েক যায়গা মরে যায়। করতোয়ার নিমম্নাংশ আত্রাই ও ফুলঝোড় নামে পরিচিত। বড়াল নদী পদ্মার চারঘাট মোহনা থেকে নাটোরের বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম হয়ে চাটমোহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নূরনগরে গুমানীর সাথে মিশে বড়াল নামেই ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বাঘাবাড়ি হয়ে হুরাসাগরের সাথে মিশে নাকালিয়া এলাকায় গিয়ে যমুনার সাথে মিশেছে। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বীতীয়ার্ধের মাঝামাঝিতে থাকলেও একেবারে শেষের দিকে রাজশাহী থেকে নূরনগর পর্যন্ত নদীটির অনেক স্থানে ক্রস বাঁধ দেয়ায় এ নদীটি এখন মৃতাবস্থায় পরে আছে। এ নদী উদ্ধারে বড়াল রক্ষা কমিটি দীর্ঘদিন যাবত আন্দোল সংগ্রাম করে আসার ফলশ্রুতিতে চাটমোহর নতুন বাজার খেয়াঘাট, বোঁথর ঘাট ও রামনগরের ঘাটের তিনটি ক্রসবাঁধ অপসারণ করা হলেও এখন ও পদ্মার সাথে যমুনার সংযোগ ঘটানো সম্ভব হয়নি এখনো। নূরনগর থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত বর্ষায় কিছুদিনের জন্য প্রাণ ফিরে পায় নদীটি। চেঁচুয়া নদী নাটোরের ধারাবারিষার দক্ষিণপাশ দিয়ে চতরার বিল, জোড়দহ, আফরার বিল, খলিশাগাড়ি বিল ও কিনু সরকারের ধর হয়ে পাবনার চাটমোহরের চরসেনগ্রামের পশ্চিমে গুমানী নদীর সাথে মিশেছে। এ নদীটি ও অস্তিত্বহীন হয়ে পরেছে।
কয়েক বছর আগে আত্রাই রিভার ড্রেজিং কাজ শুরু হলেও যেখানে বালি পাওয়া সম্ভব এমন কিছু এলাকা খনন করে সংশ্লিষ্টদের অর্থের বিনিময়ে বালি বিক্রি করতে দেখা গেলেও অজ্ঞাত কারণে খনন কাজ বন্ধ হয়। সীমিত আকারে কোথাও খনন করা হয়েছে আবার অনেক এলাকায় খনন করা হয়নি। ফলে এ খনন কাজের সুফল পাচ্ছেনা চলনবিলের কয়েক লাখ মানুষ। এমতাবস্থায় চলনবিলের নদ নদী রক্ষা করতে হলে যমুনা ও পদ্মা নদীসহ চলনবিল এলাকার প্রধান নদ নদী ও খাল সঠিক ভাবে খনন করে পানির প্রবাহ সৃষ্টি ও ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। নইলে এক সময় মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে চলনবিলের অনেক নদ নদী।
চাটমোহর সরকারি অনার্স কলেজের ভুগোল বিষয়ের বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পরিবেশবিদ ড. এস এম মুক্তিমাহমুদ জানান, ভৌগলিকভাবে এ এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো নদীর জীবন চক্রের শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ বার্ধক্য অবস্থায় পরিণত হয়েছে। লক্ষণীয় যে, চলনবিল এলাকার নদীর তলদেশের ঢালের পরিমাণ কম, নদীর প্রবাহমান পানির পরিমান কম, স্রোতের বেগও কম। উৎসস্থান থেকে নদীগুলোর দূরত্ব অধিক হওয়ায়, পানির সঙ্গে প্রবাহিত মৃত্তিকা কনা বালুকনা, নূড়িকনা এবং অন্যান্য ময়লা আবর্জনার পরিমাণ বেশি ও নদীর তলদেশে তা সঞ্চয়নের পরিমাণ ও অধিক হওয়ায় ক্রমশই নদী উপত্যকার পানি ধারণ ক্ষমতা কমে আসছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে একেবারেই শুকিয়ে যাচ্ছে নদীগুলো। উদ্ভিদ ও প্রাণিকূলের খাদ্য শৃঙ্খল ব্যহত হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন ও ফসল উৎপাদনসহ পানি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সকল কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সার্বিকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে।
Leave a Reply