
শাহজাহান বিশ্বাস: মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পদ্মা-যমুনায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে নির্বিচারে মা ইলিশ শিকার ও বিক্রি। দেখে মনে হবে ইলিশ শিকারের প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে। রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা চলছে মা ইলিশ নিধন। নদীর তীরবর্তি এলাকা ও চরাঞ্চলে ইলিশের হাট বসে প্রকাশ্যে চলছে বেচা-কেনা। স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি ফরিয়ারাও ভীর করছে এসব হাট-বাজারে। হোম ডেলিভারিতেও বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। অভিযান শেষে বেশী মুনাফায় বিক্রি জন্য চরাঞ্চল ও নদীর তীরে বাড়ি-ঘরে ফ্রিজআপ করে রাখা হচ্ছে ইলিশ। যে কারণে অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার ইলিশ মাছের দাম অনেক বেশী।
জানা গেছে, মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলায় নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা, বিক্রি ও পরিবহন বন্ধ রাখার সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরেও শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। নদীতে এ সময়েও ইলিশ ধরার মহোৎসব চলছে। এসব ইলিশ আবার হোম ডেলিভারিতে পৌছে দেওয়া হচ্ছে গ্রাহকের কাছে।
শিবালয় উজেলার তেওতা ইউনিয়নের তেওতা বাজার,আলোকদিয়ার চর ও জাফগঞ্জের-সাতুরিয়ার নদী তীরবর্তি এলাকায় চলছে এসব ইলিশ বেচাকেনা। বিশেষ ক্ষেত্রে আরিচা ঘাটে এনে চোরাই ইলিশ হোম ডেলিভারিও দিচ্ছেন অসাধু জেলে ও তাদের নিয়োগকৃত লোকজন।
তবে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যে-সব জেলেরা মাছ ধরছেন তাদেরকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের জেল, জরিমানা করা হচ্ছে। তাদের থেকে জব্দ করা জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) সরেজমিনে শিবালয়ের তেওতা ইউনিয়নের বিভিন্ন চর ও নদী তীরবর্তী এলাকায় যমুনা নদীতে জেলেদেরকে নৌকা দিয়ে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করতে দেখা গেছে।
একই দিন বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলার সমেজঘর তেওতা ও আলোকদিয়ার চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন অবৈধ মৌসুমি জেলেরা নদী থেকে ইলিশ শিকার করে তারা নদীর তীরে এনেই বিক্রি করছেন। ১ কেজির বেশি ওজনের ইলিশগুলো তারা ১৩০০/১৫০০ টাকা ও ছোট (জাটকা) ইলিশ মাছ সাড়ে ৪শ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন তারা। তবে এ সময় নদীতে মৎস্য বিভাগের কাউকে অভিযান চালাতে দেখা যায়নি। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়েও এসব এলাকায় প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীদেরকে ঝুড়ি ও ডালিতে করে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেছে।
এসব মাছ মানিকগঞ্জ, আশুলিয়া,নবীনগর, সাভার ও ঢাকা শহরে জেলে ও তাদের লোকজন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে হোম ডেলিভারিও দিচ্ছেন বলে বিশ^স্ত একটি সুত্রে জানা গেছে।
মানিকগঞ্জ মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জ জেলায় পদ্মা-যমুনা নদীর অংশে গত ১৩ অক্টোবর থেকে শুরু করে ৩১ অক্টোবর ১৮দিনে জেলায় মা ইলিশ রক্ষায় ১৭৫টি অভিযান চালিয়ে ৩৪টি মোবাইল কোর্টে ১২৫ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়াও এই ১৮ দিন অভিযান চালিয়ে ইলিশ শিকারে ব্যবহৃত অবৈধ ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মিটার কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৪শ ২৪ কেজি ইলিশ জেলেদের কাছ থেকে জব্দ করে স্থানীয় এতিমখানা ও দুস্থতদের মাঝে দান করে দেওয়া হয়েছে।
শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রতিদিনই বিভিন্ন অবৈধ মৌসুমি জেলেরা পদ্মা-যমুনা নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে ইলিশ ধরে নদীর কিনারে নিয়ে বিক্রি করছেন। সেখানে প্রকাশ্যে বড়, ছোট ইলিশ মাছগুলো মৌসুমি মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া সেখানে একটু কম দামে পাওয়ায় গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ সেখান থেকে ইলিশ কিনছেন। প্রশাসন এসে অভিযান চালালেও অজানা কারণে তারা রেহাই পেয়ে আবার অগোচরে মাছ ধরা অব্যাহত রাখছেন।
মাছ কিনে নেওয়া এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইলিশগুলো আমরা এখান থেকে একটু কম দামে কিনে নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে একটু লাভ রেখে বিক্রি করি।এতে আমাদের ভালই ব্যবসা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, নদীর তীরবর্তি এলাকা ও চরঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে তাদের ইনফরমার সেট করা আছে। নদীতে অভিযান নামলে তারা মোবাইল ফোনের মাধ্য অভিযানের অবস্থা জানিয়ে দেওয়া হয়। এতে জেলেরা প্রশাসনের চোঁখ ফাকি দিয়ে সর্তক অবস্থান করেন। এভাবে নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করছে জেলেরা।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বেলাল হোসেন বলেন, উক্ত স্থানগুলোতেও আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। আটকৃত জেলেদেরকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসনের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো.সাইফুর রহমান বলেন, অভিযান কার্যকর করতে আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি। বড় সমস্যা হচ্ছে মৌসুমী জেলেদের নিয়ে। এরা যত দিন না লোভলালসা ছাড়তে পারবে ততদিন আমাদের ভোগাবে।
Leave a Reply