
অনলাইন ডেস্ক: মাত্র ৯ শতক জমিতে বসতবাড়ি ছিল। গত বছরের বানের সময় বাড়ির অর্ধেক ভিটা ভাইঙা গেছিল। এরপর বাকি জায়গায় ঘর তুইল্যা আছিলাম। এবারও নদীতে পানি বেশি হওনে কয়দিন আগে সবটা ভাইঙা গেছেগা। এহন মানুষের জমিতে কোনোরহম ছাপড়া ঘর তুইল্যা আছি। হে ঘরও কহন ভাইঙা যাবোগা, তা নিয়া চিন্তায় থাকি। ব্রহ্মপুত্র আমগোর সব কাইরা নিল।’ এভাবেই কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের ঘুঘুমারী এলাকার গোলে বানু।
ব্রহ্মপুত্রের সাম্প্রতিক ভাঙনে সব হারিয়ে এখন দিশাহারা এ নারী। বেকার স্বামী-সন্তান নিয়ে পড়েছেন অকূল পাথারে। অসহায়ত্বের সঙ্গে বলতে থাকেন, ‘পোলার বাপের কাজ-কাম নাই। দুই পোলারে ঠিক মতন খাওয়ানও দিতে পারি না। অনেক কষ্টে বাঁচতাছি।’
চরশৌলমারী বাজার থেকে ২ কিলোমিটার দূরে ঘুঘুমারীর ভাঙন এলাকায় যেতেই চোখে পড়ে দিনমজুর জাবেদ আলীর ঝুপড়ি ঘর। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটু সামনে শুরু হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙন। ভাঙনের শিকার হয়ে রাস্তার ধারে পাটখড়ির বেড়ায় ভাঙাচোরা টিনের ছোট্ট একটি ঘরে পরিবার নিয়ে বাস করছেন জাবেদ আলী। তিনি জানান, ১ মাসের মধ্যে তার বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্রে। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। খুব কষ্টে দিন কাটছে তার মতো আশ্রয় হারানো আরও অনেকের।
জাবেদ আলীর মেয়ে জেসমিন আক্তার বলেন, চার বছর ধরে স্বামী জেলহাজতে থাকায় ঠাঁই নিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবার সংসারে। সেই সংসারটাও এখন ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়ে গেছে।
একটু দূরেই ফেরিওয়ালা সবুর আলীর বাড়ি। ২০ দিন আগে ব্রহ্মপুত্রে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বাড়িও বিলীন হয়ে যায়। এরপর অন্যের জমিতে ঠাঁই নিয়ে ঝুপড়ি ঘরে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘নদীতে সব ভাইঙা গেছে। গ্রাম-গঞ্জে ফেরি কইর্যা কোনোমতে সংসার চলে। হেইডাও বন্ধ হইয়্যা গেছে। কী করুম, না করুম বুঝতাম পারতাছি না।’
সপ্তাহ খানেক আগেই ব্রহ্মপুত্রে বসতভিটার অর্ধেক অংশ তলিয়ে গেছে সুফিয়া খাতুনের। এরপরও বাকি অর্ধেক অংশে কোনোমতে ঘর তুলে বাস করেন তিনি। কাছে যেতেই অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, ‘আমগোর কোনোখানে যাওয়ার জায়গা নাই। তাই এইখানেই থাকি। রাইতে ঘুম হয় না। দুই ম্যায়ারে (মেয়ে) নিয়া ভয়ে থাকি।’ তারও দাবি, এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি।
১০ বছর আগে ফিরোজা খাতুনকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যান স্বামী। পরে ঠাঁই নেন বাবার বাড়িতে। সেই ঠাঁইটুকুও ৭ দিন আগে বিলীন হয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্রে। এক বুক হতাশা নিয়ে ফিরোজা বলেন, ‘ভাঙন ঠেকাইতে না পারলে, নদীতে আমাগো ভাইসা (ভেসে) যাওয়াই ভালো।’
ব্রহ্মপুত্রের গ্রাসে ১ মাস আগে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়েছেন দুলুফা খাতুনও। তিনি বলেন, ‘বাড়ি-ভিটা নদীতে ভাইঙা গেছে। এরপর থ্যাইকা মাইনষের জমিতে কোনোরহম ঘর তুইল্যা আছি। হেই (সেই) ঘরে সবাইরে নিয়া থাকি। পোলার বাপে ঘোড়ার গাড়ি চলাইয়া রোজগার করেন। হেই টাকায় সংসার চলে। কিন্তু পানি আইসা কয়দিন ধইরা কাজ-কাম বন্ধ হইয়া গেছে। দুই সন্তানরে নিয়া খুব কষ্টে আছি।’
মামুন হাসান নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, তিনি কমিউনিটি ক্লিনিকে চাকরি করেন। ২ বছর আগে ঘুঘুমারী এলাকার একমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিকটিও ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়ে গেছে। এরপর থেকে ঘুঘুমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেবা দেওয়া হয়। সেই চিকিৎসা সেবারও এখন দুরবস্থা। তার ভাষ্য, স্থানীয় এক ব্যক্তি ক্লিনিকের জন্য জমি দান করলেও করা হয়নি কোনো ভবন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চরশৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কেএইচএম সাইদুর রহমান দুলাল জানান, গত ১ মাসের মধ্যে ঘুঘুমারী গ্রামের ৪০টি বসতভিটা ও আবাদি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে সুখেরবাতি, চর সোনাপুর, চর গোন্দার আলাগা ও হবিগঞ্জ এলাকা। এতে ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকশ পরিবার। গত বৃহস্পতিবার ৪০টি পরিবারের মাঝে জিআরের ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। তার অভিযোগ, ভাঙনের বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরকে একাধিকবার জানানোর পরও ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না তারা। এ ছাড়াও গত ৪ বছরে ঘুঘুমারী গ্রামের ৪০০ পরিবারের বসতভিটা নদে বিলীন হয়েছে বলে জানান এই চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ভাঙনকবলিত মানুষদের পুনর্বাসন করা জরুরি বলে দাবি করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তুহিন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে রৌমারী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেশকাতুর রহমান জানান, ৪০টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চালসহ নগদ ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রশ্ন করা হয় কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুনকে। এ সময় তিনি বলেন, গত শুক্রবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীসহ ঘুঘুমারী ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদনও পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে কাজ করা হবে। তার ভাষ্য, ভাঙন শুরু হয়েছে ৩২ কিলোমিটার জায়গায়। আর কাজ শুরু করা হয়েছে মাত্র ৬ কিলোমিটার জায়গায়। তবে জরুরি কাজের জন্য কোনো বরাদ্দ থাকে না। অনুমতি সাপেক্ষে করতে হয়। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply