
অনলাইন ডেস্ক: ১২ জুন বরিশাল-খুলনা সিটি নির্বাচনের ভোট। এরপর ২১ জুন রাজশাহী ও সিলেট সিটির ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ৪ সিটিতেই চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা।
তবে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এসব সিটিতে মেয়র পদে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন নৌকার প্রার্থীরা। তাই মেয়র পদের ভোট নিয়ে ভোটারদের মাঝে ঢিলেঢালা ভাব থাকলেও উত্তাপ ছড়াচ্ছেন কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা। এ পদ দুটি নিয়ে ভোটারদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনাও দেখা গেছে।
প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে চার সিটি নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো।
রাজশাহী: সিটি নির্বাচনে মাঠে বিরাজ করছে নিরুত্তাপ পরিবেশ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের ভাষ্য, এমন নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টির মূল কারণ হচ্ছে-বিএনপির মতো শক্তিশালী ও বড় দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনীহা এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদেরও দাঁড়াতে না দেওয়া। তা ছাড়া যারা মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন তারাও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। গত ১ জুন মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর রাসিক নির্বাচনে মেয়র পদে ৪ জন, ৩০টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১১২ জন এবং মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৪৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ সিটিতে মেয়র পদের প্রার্থীরা হলেন-আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (নৌকা), জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুল ইসলাম স্বপন (লাঙ্গল), জাকের পার্টির লতিফ আনোয়ার (গোলাপ ফুল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত মুরশিদ আলম ফারুকী (হাতপাখা)। নগরীতে আওয়ামী লীগের সরব প্রচারণা দেখা গেলেও অন্য প্রার্থীদের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়েনি। অন্যদিকে বিএনপির সাবেক নেতা সাহিদ হাসানের মেয়র পদে অংশগ্রহণের গুঞ্জন শোনা গেলেও গত ১৮ মে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে জানিয়ে দেন। এরপর নৌকার প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের চাপ আরও কমে যায়। তাই শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় এ পদ নিয়ে ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে ভোটারদের। তবে রাজশাহী নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন কাউন্সিলর প্রার্থীরা। অন্যদিকে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থীরা অংশ না নিলেও দলটির অনেক নেতাকর্মী কাউন্সিলর নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই গড়ে তিনজন করে প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। তারা তাদের নির্বাচনি প্রচারণাও চালাচ্ছেন ধুমধামে।
সিলেট: একই অবস্থা বিরাজ করছে সিলেট সিটিতেও। বিএনপি অংশ না নেওয়ায় অনেকটা উত্তাপহীন প্রচারণা চলছে এই সিটিতে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীর সঙ্গে অন্য মেয়রপ্রার্থীদের ফারাকও বেশ। এ ক্ষেত্রে বিএনপিবিহীন নির্বাচনের আমেজ কিছুটা ধরে রেখেছেন সিটির ৪২ ওয়ার্ডের বিএনপির ৪০ জন কাউন্সিলর প্রার্থী। নির্বাচনের দিন ভোটার টানতে মূল ভূমিকা রাখবেন এই প্রার্থীরা। ফলে মেয়র পদে বিএনপির ভোট কে পাবে এ নিয়েও রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিগত দুই বার আরিফের হাত ধরেই নগর ভবনে বিএনপির অবস্থান ছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকার কারণে এবার বিএনপি কোনো ধরনের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ২০ মে আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিলে আওয়ামী লীগের জন্য অনেকটা সহজ হয়ে গেছে বলে মনে করছে নগরবাসী। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অনেকটা ফাঁকা মাঠে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বলে তার অনুসারীরাও উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকায় যতই দিন যাচ্ছে ততই বিএনপির ভোট নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে সরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়ায় অনেকেই লাঙ্গল প্রতীকে বিএনপির ভোট যেতে পারে বলে ধারণা করছেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল বলেন, আওয়ামী লীগ আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলছে। সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক সংগঠনের যে নীরব ভোট রয়েছে, তা আমার পক্ষেই থাকবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করব।
খুলনা: কেসিসি নির্বাচনে ভারী কোনো প্রার্থী না থাকায় তালুকদার আবদুল খালেক পুনরায় মেয়র হবেন-এমন প্রত্যাশা করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। খুলনায় সাড়ে ৪২ হাজার ভোটারের কাছে নতুন প্রার্থীরা পরিচিত মুখ নন। তাই অনেকটাই শক্ত অবস্থানে আছেন তালুকদার আবদুল খালেক। খুলনায় মেয়র পদে ৫ জন, ৩১টি ওয়ার্ডে সদস্য পদে ১৩৬ জন ও সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে ৩৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রোববার দৌলতপুর এলাকায় গণসংযোগকালে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করে প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করার আহ্বানও জানান তিনি।
বরিশাল: অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও নৌকার প্রার্থীকে জেতাতে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্র থেকে শুরু করে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মেয়রপ্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে কাজ শুরু করেছেন।
তবে নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ সিটিতে চতুরমুখী চাপে আছেন নৌকার প্রার্থী। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নৌকাকে ডোবাতে পারে। যেমনটি হয়েছিল গাজীপুর সিটি নির্বাচনে। সেখানে নৌকার ব্যাজ পরে ঘড়িতে ভোট চেয়েছে নৌকার সমর্থকরা। এ ছাড়া বিএনপির দলীয় প্রার্থী না থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামালের ছেলে কামরুল আহসান রুপন। আর নিজের জেলা হওয়ায় শক্ত অবস্থানে রয়েছে হাতপাখা, অন্যদিকে ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া জাতীয় পার্টিও। তবে এসব চাপকে কিছু মনে করছে না আওয়ামী লীগ।
তবে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও উত্তাপ ছড়াচ্ছেন কাউন্সিলর প্রার্থীরা। প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক প্রার্থী থাকায় সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। রোববার নগরীর ১৪নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী শাকিল হোসেন পলাশকে মারধর ও তার নির্বাচনি অফিস ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে রিয়াদ হোসেন সাজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পলাশের সমর্থকরা পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় ঘেরাও করে। এ ছাড়া গত শুক্রবার নগরীর ১০নং ওয়ার্ডে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষও হয়। যেখানে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন। সে ঘটনায় প্রায় ১০ জন আহত হন। অন্যদিকে বিসিসি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপনের তিন কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে রুপন বলছেন গ্রেফতার কারও বিরুদ্ধে মামলা ছিল না। নির্বাচনে তাকে হয়রানি করতেই এই গ্রেফতার করা হয়েছে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সিটি নির্বাচন দলীয়ভাবে নিরুত্তাপ হলেও ব্যক্তিগতভাবে কাউন্সিলর পদে পাস করার জন্য এখানে যথেষ্ট উত্তাপ আছে। ভোটাররা কিন্তু আগ্রহ নিইে আসবে কাউন্সিলর পদের জন্য। এ সময় মেয়র পদে একটি ভোট দেওয়া দরকার তাই দেবে।
তিনি বলেন, এটাকে স্থানীয় সরকারের সমস্যা বলা ঠিক হবে না। এখানে জাতীয় সমস্যা স্থানীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এটা জাতীয়ভাবেই সমাধান করতে করে প্রার্থীদের নির্বাচনমুখী করতে হবে। যাতে সব জায়গা থেকে সব দল থেকে যোগ্য প্রার্থী থাকে।
এ ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা কী হতে পারে জানতে চাইলে সাবেক এই কমিশনার বলেন, ইসি একটি ফ্রি ফেয়ার নির্বাচন করার জন্য একটা নিশ্চয়তা দিতে পারে। তবে এটি আসলে অনেক টাফ। ইসি তো নিজে কিছু করবে না। প্রশাসনের মাধ্যমে করাতে হবে। কিন্তু মামলার ভয়ে অনেকে নির্বাচনে দাঁড়াতে চান না। তাই ইসি কিসের ভিত্তিতে নিশ্চয়তা দেবে।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, মেয়র পদে কোথাও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী নেইÑতাই চলছে ঢিলেঢালা ভাব। নির্বাচন মানে শক্তিশালী বিকল্প থাকতে হবে তা না হলে তো নির্বাচনই হয় না। আশা করি ৪ সিটি নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে, তবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
Leave a Reply