
অনলাইন ডেস্ক: এডিস মশার বিচরণ শহর এলাকাতেই বেশি ছিল। তাই বর্ষায় নগরকেন্দ্রিক মশাবাহিত রোগ ছিল ডেঙ্গু। কিন্তু এখন তা গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে সারা বছরই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে মারাও যাচ্ছে। গত পাঁচ মাসের ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।
শনিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে নতুন ৫১ জন রোগী ঢাকার বাসিন্দা। গতকাল পর্যন্ত ১ হাজার ২৪০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত পাঁচ মাসে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১২ জন মারা গেছেন। ২০০০ সালে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর থেকে প্রথম পাঁচ মাসে এত মৃত্যু আর কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেও এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ। মশাবাহিত এ রোগ থেকে সবাইকে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।
ডেঙ্গু রোধে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা অফিস পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। প্রতিষ্ঠানের ভবন ও আশপাশে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থলে যাতে পানি জমতে না পারে তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে স্কুল-কলেজ ও শিক্ষা অফিসগুলোকে। এ ছাড়া ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে সব শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে। মাউশির এই আদেশ সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল কলেজের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এই বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ঘিরে আগে থেকেই একটু বাড়তি সতর্কতা দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ডেঙ্গুতে শনাক্তের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কার কথাও বলছে তারা। সাধারণত বর্ষাকালেই ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বিস্তার হয়ে থাকে। আর ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়ে থাকে জুলাই মাসের পর থেকে। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনে এখন বর্ষার সময়কাল অনুমান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। মশাবাহিত এই রোগ থেকে বাঁচতে মশার কামড় থেকে মুক্ত থাকতে হবে। আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাসা-বাড়ির ছাদ, আঙিনায় যেন পানি জমে না থাকে সেই বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসে। তখন প্লাটিলেট কমে রক্তক্ষরণে রোগীরা শক সিনড্রোমে চলে যায়। রক্তক্ষরণ ও শরীরের পানিশূন্যতার কারণে রোগী অচেতন হয়ে পড়া এই শক সিনড্রোমে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
আর কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা নিয়ে ভাবার চেয়েও বেশি জরুরি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা। এমনটা না হলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে পুরো দেশজুড়েই।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার অধীনে ‘জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি’র আওতায় পরিচালিত জরিপে ঢাকার ১০০ বাড়ির মধ্যে চারটিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়েছে। ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেঙ্গু মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ঢিলেমি দেখা যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে যে মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, এর ৯৯ দশমিক ১৪ শতাংশ এডিস ইজিপ্টি এবং শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ এডিসএলবো পিক্টাস জাতের। ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক মূলত এই দুই ধরনের মশা। এর মধ্যে এডিস ইজিপ্টি মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু বেশি ছড়ায়। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ড, যেখানে মশার ঘনত্ব বা ব্রুটো ইনডেক্স ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জরিপে দেখা গেছে, বহুতল ভবনে এডিস মশার ঘনত্ব ছিল ৩৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ৩২ দশমিক ২৮ শতাংশ, পানিপূর্ণ ফ্লোরে ২৫ দশমিক ৫২ শতাংশ, প্লাস্টিক ড্রামে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ, প্লাস্টিকের বালতিতে ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং মিটারের গর্তে ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ৪০টি ওয়ার্ড পরিদর্শন করে পাঁচটি ওয়ার্ডকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। চারটি ওয়ার্ড অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেগুলো হলো ৩, ২৩, ২৬ ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪.১৮ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ৫৮টি ওয়ার্ড পরিদর্শন করে ১৩টি ওয়ার্ডকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। চারটি ওয়ার্ড অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেগুলো হলো ২, ১২, ১৬ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল। এ সময় ১৫ হাজার ১২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়, মারা যায় ২৩৩ জন। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমে আসে। সে সময় মোট আক্রান্ত হয় ৬ হাজার ৬৫৬ জন; মারা যায় ৯ জন। ২০১৫ সাল থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার বাড়তে থাকে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ এই চার বছরে ২২ হাজার ১৩৯ জন আক্রান্তের পাশাপাশি ৫৪ জনের মৃত্যু হয়। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৫০ হাজার ১৪৮ জনের ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে সরকারের খাতায়। আর ২০১৯ সালে তিনগুণ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। সে বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল, মৃত্যু হয়েছিল ১৬৪ জনের।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, এবার ঢাকায় ডেন-ফোরের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার বাইরে কক্সবাজারে ডেন-ওয়ান, ডেন-থ্রি ও ডেন-ফোর সেরোটাইপ ডেঙ্গু হচ্ছে। একাধিক সেরোটাইপে সংক্রমণে গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি হয়।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, জ্বর উঠলে নিজ থেকে প্যারাসিটামলের বাইরে কিছু সেবন করা যাবে না। তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।
তিনি বলেন, সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গু সেরে যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। গত বছরের ডেঙ্গু রোগীদের বেশিরভাগ ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে পরিণত হচ্ছিল। ফলে আক্রান্তের পাঁচদিন পর রোগী যখন মনে করে সে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে তখনই তার অবস্থা খারাপ হয়। জ্বর যখনই কমে আসছে, রোগীর রক্তচাপও কমে যাচ্ছে। সে সময়ে ভালো চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
Leave a Reply