
অনলাইন ডেস্ক:২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে সরকার।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে এ সময়ের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন করতে হবে। কিন্তু সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে, এখনও দেশে শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত ১৮ লাখ শিশু। দিন দিন তা বাড়ছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আছে প্রায় ১৩ লাখ শিশু। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস-২০২৩। দিবসেব এবারের প্রতিপাদ্য দেওয়া হয়েছে ‘শিশুর শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করি, শিশুশ্রম বন্ধ করি’।
প্রতি বছর ১২ জুন শ্রম এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ভিশন, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম এবং এডুকো-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘভুক্ত সব দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইউনিসেফ বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের এই সংস্থা গত ৭ ফেব্রুয়ারি এক পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানায়, দেশে এখন ১৮ লাখ শিশু জড়িত শ্রমে। আর ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুদের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি অতিমারি করোনায় শিশুশ্রম আরও বেড়েছে। অর্থের কারণে অভিভাবকরা সন্তানকে কাজে পাঠিয়েছে। এতে অনেক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। বাধ্য হয়েই শিশুশ্রমে ঝুঁকছে শিশুরা। এ চিত্র শুধু দেশের নয়, সারা বিশে^র। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে ৮৪ মিলিয়ন শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। শিশুশ্রমের দিক দিয়ে আফ্রিকা ও এশিয়া বিশে^র শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। আফ্রিকা এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোতে প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জনই শ্রমে জড়িত। গত বছরের ১০ জুন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, মহামারি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকি পরিস্থিতি আরও গুরুতর করে তুলছে। মানুষকে যদি দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে মুক্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে প্রায় ৫ কোটি শিশু আগামী দুই বছরে শিশুশ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হবে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি কারখানায় কাজ করে ১২ বছরের শিশু অমিত হোসেন। করোনার সময় তাকে কাজে পাঠিয়েছে তার বাবা। আট ঘণ্টা কায়িক পরিশ্রম করে অমিতের যা আয় হয় সব পাঠাতে হয় গ্রামে। তার বাবা রংপুরে রিকশা চালান।
অমিত জানায়, করোনার আগে সে স্কুলে যেত। সংসারে অভাবে বাধ্য হয়েই সে শ্রমে জড়িয়েছে। পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও কাজের চাপে সুযোগ নেই। তার মতো এমন অনেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ হবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আমরা এখনও শিশুশ্রম কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে পারছি না। এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক।
তারা বলেন, দরিদ্রতা, অশিক্ষা, অসচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা শিশুদের শ্রমের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এ ছাড়া সমাজ ও পারিবারিক বৈষম্য দিন দিন প্রকট হওয়ায় শিশুশ্রম বাড়ছে। এ শিশুদের কেউ টাকার অভাবে স্কুলে যেতে পারে না। বাধ্য হয়ে বাসাবাড়ির ময়লা পরিষ্কার কিংবা কলকারখানা, ইমারতে কাজ করে তারা।
সমীক্ষায় দেখা যায়, শ্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি কমে যায়। শিশুশ্রমে নিযুক্ত ৬৫ শতাংশ শিশু স্কুলে যায় না। এদের মধ্যে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কখনো স্কুলে যায়নি।
শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন অপরাজেয় বাংলাদেশের প্রধান ওয়াহিদা বানু সময়ের আলোকে বলেন, যত সংখ্যক শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত, সে অনুযায়ী নিরসন পদক্ষেপ সামান্য। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের পদক্ষেপ জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখতে সরকারি-বেসরকারিভাবে পদক্ষেপ আরও জোরালো হওয়া উচিত। শিশুরা হালকা কাজ করলেও পড়াশোনাকে আবশ্যক করতে হবে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা আসলে শিশুশ্রমকে সহজে গ্রহণ করে নিয়েছি। সেটা আর্থিক কিংবা সামাজিক কারণে হতে পারে। নিয়োগকর্তারা কম পয়সায় কাজ করানোর জন্য শিশুদের ব্যবহার করছেন বাসাবাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানে।
ওয়াহিদা বানু মনে করেন, শিশুদের নিয়ে আইন এবং অনেক নীতি তৈরি করা হলেও সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে অনেক ধীর গতিতে। শিশুরা ভোটার না, তাই রাজনীতিবিদরা তাদের দিকে নজর দেন না। তারা যদি ভোটার হতো তা হলে নির্বাচনের আগে হলেও তারা শিশুদের জন্য কিছু করত।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে শিশুশ্রম নিরসনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমরা গত বছর ২২ মার্চে কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স সম্পর্কিত আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুসমর্থন করেছি। এ কনভেনশন অনুসমর্থনের মাধ্যমে ৮টি মৌলিক কনভেনশনের সবকটি মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োজিত করা যাবে না। আমরা ৪৩টি খাতকে শিশুশ্রমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে ঘোষণা করেছি। এসডিজির অভিক্ষা ৮.৭ অনুযায়ী সব খাত থেকে শিশুশ্রম নিরসনে আমরা সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
Leave a Reply