
অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের কেউ ক্ষতি করছে বা জনগণের ক্ষতি করছে, সেটাকে রোধ করতে গিয়ে যদি আমাদের শক্ত অবস্থানে যেতে হয় তাহলে আমরা অবশ্যই যাবো। মরণ কামড় কেউ দিলে আমরাও তা প্রতিহত করবো, এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা শান্তিপূর্ণ সব সমাধান চাই।
রোববার (৪ জুন) পার্বত্য জেলা বান্দরবান রিজিয়ন পরিদর্শনকালে সেনাপ্রধান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। মূলত এই বান্দরবানে বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাধী পাহাড়ি সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ)’ সশস্ত্র তৎপরতা ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি এই কেএনএফ সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলা ও তাদের পুঁতে রাখা ‘আইইডি’ বিস্ফোরণে একাধিক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানের মাঝেই রোববার সরেজমিনে বান্দরবানের ওইসব এলাকা পরিদর্শন করলেন সেনাবাহিনী প্রধান।
সেনাবাহিনী প্রধান সেখানে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এ জায়গাটি (বান্দরবান) অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। এখানে যাতায়াত করা খুব কঠিন। প্রতিটি জায়গায় আমরা অপারেশন চালিয়েছি। তাদের যে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মূল ঘাঁটি সেটা দখল করেছি, তাদের মূল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল সেটাও আমরা দখল করেছি। তারা এখন আর এ এলাকায় নাই। তারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মিশে কিছু কিছু আছে। আমরা চাই, তারা বাংলাদেশের জনগণ, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে, এটাই আমাদের কাম্য। তারা বাংলাদেশের শত্রু হোক এটা আমরা কখনই চাই না।
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আইইডি’ (মাইন) এখানে নতুন একটি মাত্রা। কেননা, মাটির নিচে জঙ্গলে কোথায় কিভাবে পুঁতে রাখা হয়েছে সেটা নি:সন্দেহে খুবই ঝুঁকির বিষয়। এরমাঝেই আমরা নিজস্ব সতর্কতা বাড়িয়ে ডগস্কোয়াডসহ নানা ‘আর্টিফিসিয়ালি’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘আইইডি’ অপসারণের কাজ করছি। আমরা চেষ্টা করছি আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে। আমরা আশা রাখছি, ভবিষ্যতে এ জাতীয় বিষয়ে আরও অনেক বেশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত হবে।
কেএনএফ’র সশস্ত্র তৎপরতা বা আত্মসমর্পন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, কেউ যদি শান্তির পথে আসতে চাই, অবশ্যই তাকে স্বাগত জানাবো। আমরা তো সেটাই চাচ্ছি। শান্তিতে যেটা সমাধান হবে সেটাতে সহিংসতায় আমরা কেন যাবো। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খুবই মানবিক। আমরা সারাবিশ্বে মানবিকতার জন্য বিখ্যাত। জাতিসংঘে আমরা কিন্তু অনেকদিন ধরে এক নম্বরের শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। এটার অর্জনের পেছনে যে সমস্ত গুনাবলি আছে তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে- মানুষের প্রতি দরদ এবং সহনশীলতা। মানবিধকার লঙ্ঘন বা এই জাতীয় কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কখনো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নাই। এটা আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি।
জেনারেল শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বান্দরবানে আমাদের এ অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার কারণে আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছি। এখানে সন্ত্রাসীদের তৎপরতাটা এতো বেশি বেড়েছে যার ফলশ্রুতিতে আমাদের কিছু সেনা সদস্যদের আমরা হারিয়েছি। যেটা আমাদের চলমান অভিযানকে কিন্তু থামাতে পারেনি। আমরা অপারেশন অব্যাহত রেখেছি। আমি আজকে খুব খুশি, কারণ যে মনোবল, যে সাহসিকতা নিয়ে আমাদের সৈনিকরা, অফিসাররা এখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাতে আমি আশাবাদী। যে অভিষ্ঠ লক্ষ্য নিয়ে আমরা অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছি সেটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারবো। আমরা আপাতত এলাকার পরিস্থিতিকে স্থিতিশীলতায় এনেছি। ধীরে ধীরে পাহাড়ের আরও এলাকা ‘ক্লিয়ার’ করবো। দেশে সিভিল প্রশাসন আছে, আমাদের পুলিশ আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, বিজিবি আছে তারা আস্তে আস্তে তাদের যে দায়িত্বগুলো সেটা পালন করতে থাকবে। সেনাবাহিনীর যে বিশেষ অভিযান সেটা ইতিমধ্যেই প্রায় শেষ করে এনেছি। আমরা আশা করছি আমাদের যে দায়িত্ব সেটা সঠিকভাবে শেষ করতে পরবো।
পর্যটক নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, পর্যটন নিষেধাজ্ঞাটা অবশ্যই অশান্ত পরিস্থিতির কারণেই। এ নিষেধাজ্ঞা চলে যাবে, পরিস্থিটিটা যখন শান্ত হবে। এ ব্যাপারে আমি আশাবাদী। যেটুকু এলাকা আমাদের ‘ঝঞ্ঝাটমুক্ত’ বা ক্লিয়ার করার কথা ছিল সেটা কিন্তু করা হয়েছে। এটা নিয়ে আরও কাজ চলছে। এখানে সীমান্ত সড়ক তৈরি হচ্ছে। সেটাও খুব দৃষ্টিনন্দন। আমার মনে হয়, এখানে দলে দলে পর্যটক আসবে। এমনকি এটা আমাদের দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন স্পটে পরিণত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সেনাবাহিনী প্রধান বান্দরবান রিজিয়ন পরিদর্শনকালে রিজিয়ন সদর দফতরের সকলস্তরের সেনাসদস্যদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ, জিওসি ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও এরিয়া কমান্ডার চট্টগ্রাম এরিয়া, বিজিবি মহাপরিচালক এবং ১০ পদাতিক ডিভিশন ও কক্সবাজার এরিয়া কমান্ডার, সেনাসদর ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের উর্ধতন কর্মকর্তা, বান্দরবান রিজিয়ন সদর দফতরের সামরিক কর্মকর্তা, জেসিও এবং অন্যান্য পদবীর সেনা সদস্যসহ গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধানের এ সফর পার্বত্য চট্টগ্রামের সকলস্তরের সেনা সদস্যদের মনোবল সুদৃঢ় করবে এবং নতুন উদ্যমে দায়িত্ব পালনের অনুপ্রেরণা যোগাবে বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।
Leave a Reply