
অনলাইন ডেস্ক: মানুষের জীবন সবসময় এক ধারায় প্রবাহিত হয় না। সবার জীবনেই আসে প্রতিকূল অবস্থা। ধনী বা গরিব, ভালো বা মন্দ সবার জীবনের দুঃখগাথা মানুষ হিসেবে অভিন্ন। তবে স্মরণ রাখতে হবে জীবনের কোনো সংকট স্থায়ী নয়। যেমন স্থায়ী নয় রাতের কালো আঁধার, আকাশের ঘন মেঘ, চাঁদের অমাবস্যা। এ জন্য সত্যিকার মুমিনগণ দুঃখের পাহাড় দেখে ভেঙে পড়েন না, কষ্টের ভয়াল রূপ দেখে মুষড়ে যান না। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, দুঃখের সঙ্গে সুখ আছেই। কষ্টের পরে আনন্দ আসবেই। রবের এ পরীক্ষা একদিন শেষ হবেই। দয়াময় আল্লাহ একদিন অবশ্যই উদ্ধার করবেন এই বিপদ থেকে যেকোনোভাবে। সে কথাই তো পবিত্র কুরআনে বিধৃত হয়েছে বারবার, যাতে বান্দা অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘প্রকৃতপক্ষে কষ্টের সঙ্গে স্বস্তিও থাকে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তিও থাকে’ (সুরা বালাদ : ৫-৬)। অনুকূল-প্রতিকূল যে পরিস্থিতিই জীবনে আসুক, সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সঁপে দিলে জীবন হবে সুন্দর ও সুখময়।
জীবন ধ্বংসের অভিশাপ নয়
ইসলাম মানুষকে আশাবাদের প্রেরণা দেয়। হতাশা ও মুষড়ে পড়ার কোনো কারণ ঈমানদারের নেই। মানুষ যখন ঈমান ও বিশ্বাসের শৃঙ্খলে থাকবে, কোনো কষ্টই তাকে পরাস্ত করতে পারবে না। তবে দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, ঈমান থেকে দূরে সরে যাওয়ায় বাড়ছে হতাশা ও আত্মধ্বংসের প্রবণতা। প্রতিনিয়তই শোনা যায় আত্মহত্যার বিভীষিকাময় কাহিনি। পত্রিকার পাতা খুললেই হরহামেশা আত্মহত্যার দুঃসংবাদ দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী সারা বিশ্বে আত্মহত্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যার মতো জঘন্যতম পথ বেছে নেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন আত্মহত্যা করে, যাদের বেশিরভাগই নারী। নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট আত্মহত্যাকারীর বেশিরভাগের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। টগবগে যুবক-যুবতীরাই এ কলঙ্কের পথে অগ্রগামী। অনেকে সাংসারিক কলহ-দ্বন্দ্বে পড়ে, অতিরিক্ত রাগের বশবর্তী হয়ে, কাক্সিক্ষত কোনো কিছু লাভ করতে না পেরে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে কিংবা লজ্জা ও মানহানিকর কোনো কিছু ঘটে যাওয়ায় আত্মহত্যার মতো জঘন্যতম পথ বেছে নেয়। আত্মহননের চিন্তা মূলত শয়তানেরই কারসাজি। সে তো মানুষকে পথভ্রষ্ট করতেই বদ্ধপরিকর।
জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবন-মরণ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। বস্তুত এ দুনিয়াটা পরীক্ষাগার। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মহিমাময় সেই সত্তা, যাঁর হাতে গোটা রাজত্ব। তিনি সবকিছুর ওপর পরিপূর্ণ শক্তিমান। যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য যে, কর্মে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম। তিনিই পরিপূর্ণ ক্ষমতার মালিক, অতি ক্ষমাশীল’ (সুরা মুলক : ১২)। এ জীবন আমাদের কাছে আল্লাহ তায়ালার দেওয়া অমূল্য আমানত। তিনি জান্নাতের বিনিময়ে আমাদের সবকিছু ক্রয় করে নিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন যে, তাদের জন্য জান্নাত আছে’ (সুরা তওবা : ১১১)। তাই ইচ্ছা হলেই তাঁর দেওয়া আমানতে হস্তক্ষেপ করে জীবনকে শেষ করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
আত্মহনন সমস্যার সমাধান নয়
আত্মহত্যা বিপদমুক্তির সঠিক পন্থা নয়, নয় কোনো সমস্যার সমাধান। আত্মহত্যা মূলত আত্মপ্রবঞ্চনারই নামান্তর। কেননা এটা চরম ও চূড়ান্ত ব্যর্থতা। এর দ্বারা কোনো কিছুই অর্জন হয় না। বরং একূল, ওকূল-দুকূলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হয় কলঙ্কিত, ধিকৃত ও নিন্দিত। যারা পরকালে বিশ্বাসী তারা কখনো আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে না। পরকালে আত্মহত্যাকারীদের কঠিন শাস্তি হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে। চিরকাল সে জাহান্নামের ভেতর ওইভাবে লাফিয়ে পড়তে থাকবে-যে লোক বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে থাকবে। চিরকাল সে জাহান্নামের মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে লোক লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের ভেতর সে লোহা তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে তা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে’ (বুখারি : ৫৭৭৮)। চিন্তা করার বিষয় হলো, মানুষ রাগ-অভিমানে অশান্তি ও হতাশা থেকে পরিত্রাণ পেতেই আত্মহননের ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়। কিন্তু আসলেই কি সে এর মাধ্যমে শান্তির দেখা পায়? না, কখনো নয়। বরং সে সাময়িক দুঃখ থেকে রক্ষা পেতে নিজেকে আখেরাতের কঠোর আজাবের দিকে ঠেলে দেয়। দুনিয়ার কষ্ট যত বড়ই হোক আখেরাতের কষ্টের কাছে তা কিছুই নয়।
বিপদে করণীয়
মানুষ বিপদে পড়লে করণীয় কী? এ ক্ষেত্রেও দয়াময় আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তিনি মুমিনদের নামাজ এবং সবরের মাধ্যমে তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়ার আদেশ দিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য লাভ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে আছেন’ (সুরা বাকারা : ১৫৩)। পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, তওবা এবং ইস্তেগফার করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার পড়লে আল্লাহ তাকে প্রত্যেক বিপদ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন, সব দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না’ (আবু দাউদ : ১৫১৮)। অতএব জীবনের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হলে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে মধুময় সম্পর্ক স্থাপন করে সব প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করে নিতে হবে। তবেই আমাদের জীবনকানন ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে উঠবে, বেদনার কালো রাত দূর হয়ে উঁকি দেবে সোনালি প্রভাত।
Leave a Reply