1. shahjahanbiswas74@gmail.com : Shahjahan Biswas : Shahjahan Biswas
  2. ssexpressit@gmail.com : sonarbanglanews :
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ন
সর্বশেষ :
শিবালয়ে দুই বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি’র সভাপতি হলেন মো.শহীদুর রহমান শিবালয়ে মাদক বিরোধী মতবিনিময় সভা শিবালয়ে ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে সেমিনার অনুষ্ঠিত দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে গেল বাস ঈদের প্রস্তুতি দেখতে আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাট পরিদর্শনে নৌপ্রতিমন্ত্রী শিবালয়ে জাতীয় কবিকাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী পালিত আরিচা-পাটুরিয়া ঘাটে মটরসাইকেল ও ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিতে শিবালয়ে নানা আয়োজন শিবালয়ে মাদক, সন্ত্রাস ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ সভা পশুর হাটসহ আরিচা ও পাটুরিয়া ঘাটে-ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কাজ করছে র‌্যাব

বেঞ্চ ফাঁকা, শিক্ষক একা, বিপন্ন গ্রামীণ বিজ্ঞান শিক্ষা

  • সর্বশেষ আপডেট : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬
  • ৪৮৩ বার পড়েছেন

মোঃ মনিরুল ইসলাম:আমি ক্লাসরুমে ঢুকে হোয়াইটবোর্ডের সামনে দাঁড়াই। হাতে মার্কার পেন নিয়ে বোর্ডের দিকে তাকাই, তারপর ফিরে তাকাই বেঞ্চগুলোর দিকে। প্রথম এক-দুটি বেঞ্চে বড়জোর  দু-চারজন শিক্ষার্থী বসে আছে। পেছনের সারি সারি বেঞ্চগুলো খাঁ খাঁ করছে। শূন্য, নিস্তব্ধ সেই ক্লাসরুমের দিকে তাকিয়ে বুকটা হু হু করে ওঠে। হৃদয়ের ভেতর থেকে যেন এক চিলতে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়।

বলছিলাম গ্রামীণ একটি বিদ্যালয়ের একজন অসহায় বিজ্ঞান শিক্ষকের কথা। যে শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীদের কোলাহলে এবং নতুন কিছু জানার কৌতূহলে মুখরিত থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ এক অবর্ণনীয় শূন্যতা। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কোথায় হারিয়ে গেল, এই শূন্যতা কীভাবে পূর্ণ হবে—এই প্রশ্নগুলো প্রতিদিন আমার হৃদয়কে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। কিন্তু নীতিনির্ধারণী বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নিজেকে বড্ড অসহায় ও কোণঠাসা আবিষ্কার করি।

একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে রাষ্ট্র বা সমাজ আমাকে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়েছে, তাতে আমি নিজেকে ক্ষমতাহীন, শক্তিহীন এবং মর্যাদাগতভাবে এক প্রকার পঙ্গুই মনে করি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গিয়ে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকি বোর্ডের দিকে, আর একা একা ভাবি—আমরা কি তবে জেনেশুনেই দেশের একটা বড় অংশকে বিজ্ঞানহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের এই আশঙ্কার পিঠে এক চরম নিষ্ঠুর সত্য ছুড়ে দিয়েছে। ১৯৯০ সালে যেখানে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল ৪২.৮১ শতাংশ, বর্তমানে তা কমতে কমতে প্রায় ২২ শতাংশে এসে ঠেকেছে! বিজ্ঞানের এই নীরব রক্তক্ষরণ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষকদের ডায়েরি থেকে যদি বাস্তব সংকটের পাতাগুলো উল্টানো যায়, তবে প্রধান কয়েকটি ক্ষত স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

এর পেছনে প্রধান কারণগুলোর একটি হলো—ল্যাবরেটরিহীন বিজ্ঞান শিক্ষা। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাধ্যমিক স্কুলেই কোনো কার্যকর বিজ্ঞানাগার নেই। ফলে বিজ্ঞানকে আমরা রসকসহীন ইতিহাসের মতো মুখস্থ করাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিজ্ঞান পড়া এখন এক বিশাল বিলাসিতা। ব্যবহারিক খাতা কেনা, উচ্চমূল্যের সহায়ক সামগ্রী এবং প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা প্রাইভেট টিউটরের পেছনে খরচ করার সামর্থ্য গ্রামীণ অধিকাংশ অভিভাবকের নেই।

এর ওপর যুক্ত হয়েছে জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক এক অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়ে একটু কম নম্বর পেলেই যেখানে জিপিএ-৫ ছুটে যাওয়ার ভয় থাকে, সেখানে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই তুলনামূলক সহজ পথ বেছে নিচ্ছে। মেধা বিকাশের চেয়ে সার্টিফিকেটের গ্রেডই এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্র যখন কাগজের পাতায় ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ কিংবা ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের’ স্বপ্ন দেখে, তখন গ্রামীণ বিজ্ঞান শিক্ষার এই নড়বড়ে ভিত আমাদের মূল লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আর রোবোটিক্সের যুগে বিজ্ঞানবিমুখ একটি জাতি কখনোই বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। বিজ্ঞান শিক্ষাকে অবহেলা করে কোনো রাষ্ট্র মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন করতে পারে না।

এই দুর্দশা থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এখনই কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে:

১. ল্যাবরেটরি সেন্ট্রিক শিক্ষানীতি: প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক এবং সচল বিজ্ঞানাগার নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য বিশেষ সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ইন্টারঅ্যাক্টিভ ও আধুনিক টিচিং মেথডোলজির ওপর সরকারি অর্থায়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার: বিজ্ঞান শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতি থেকে বের করে এনে সৃজনশীলতা ও কৌতূহলভিত্তিক মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

৪. জাতীয় বিজ্ঞান সচেতনতা: শুধু শহরের নামী স্কুল নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতেও নিয়মিত বিজ্ঞান মেলা, অলিম্পিয়াড এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন বাড়াতে হবে।

শ্রেণিকক্ষে যখন কোনো শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের একটি জটিল সূত্র বুঝতে পেরে আনন্দে হেসে ওঠে, একজন শিক্ষক হিসেবে সেটাই আমার পরম পাওয়া। কিন্তু সেই হাসিমুখের সংখ্যাটা দিন দিন কমে যাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার আকুল আবেদন, আমাদের স্কুলগুলোর বিজ্ঞান বিভাগকে এভাবে মরে যেতে দেবেন না। আজ যদি আমরা বিজ্ঞানের আলো নেভাতে শুরু করি, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক চরম অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়াবে।

ক্লাসরুমের এই শূন্য বেঞ্চগুলো আমাদের ভবিষ্যতের মেধা সংকটেরই আগাম সংকেত দিচ্ছে। একজন ক্ষমতাহীন শিক্ষক হিসেবে আমি শুধু পত্রিকার এই পাতায় আমার কলমের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে আকুল আবেদন জানাতে পারি—আমাদের গ্রামীণ স্কুলগুলোর বিজ্ঞান বিভাগকে এভাবে মরে যেতে দেবেন না। আজ যদি আমরা এই শূন্য ক্লাসরুমগুলোর হাহাকার শুনতে না পাই, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়াবে।

(লেখক: মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্তরের একজন বিজ্ঞান শিক্ষক)

খবরটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন :