
অনলাইন ডেস্ক: একটি উড়োজাহাজ প্রতিদিন শত শত যাত্রী বহন করে। একেকটি উড়োজাহাজের মূল্য শত শত কোটি টাকা। এমনই ১১টি উড়োজাহাজ প্রায় এক যুগ ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গত ১২ বছর ধরে এ উড়োজাহাজগুলো থেকে কোনো আয় নেই বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)।
উল্টো বিশাল এলাকা দখল করে রাখায় শাহজালাল কর্তৃপক্ষের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে উড়োজাহাজগুলো। এ ছাড়া রয়েছে বেশ কিছু গাড়ি ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং মালামালও। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, এগুলো নিলামে বিক্রি করার প্রক্রিয়া চলছে। যত দ্রুত সম্ভব এগুলো বিক্রি করা হবে। অক্টোবরে থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনের আগেই এগুলো সরানো হবে।
শাহজালাল সূত্রে জানা গেছে, বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা ১১টি উড়োজাহাজই অকেজো হয়ে গেছে। এগুলো রফতানি কার্গো ভিলেজের সামনে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজ আছে আটটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি, অ্যাভিয়েনা এয়ারলাইন্সের একটি। এ ছাড়া রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি লিজে আনা উড়োজাহাজ রয়েছে, যা ব্যবহার উপযোগী। এটা বাদে বাকি ১১টি নিলামে বিক্রি করার প্রক্রিয়া চলছে।
শাহজালাল কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিত্যক্ত ১১টির মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আট ও জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজের ডি-রেজিস্ট্রেশন করেছে বেবিচক। বাকিগুলোর ডি-রেজিস্ট্রেশন হলে নিলামে বাধা থাকবে না। এসব এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে পার্কিং ফিসহ নানারকম বকেয়া রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর। এ ১২টি উড়োজাহাজের পার্কিং চার্জ ও সারচার্জ বাবদ বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম সময়ের আলোকে জানান, বছরের পর বছর ধরে কার্গো ভিলেজের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ১১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজের সংখ্যা বেশি। একটা উড়োজাহাজ শিফট করা হয়েছে। আমরা এগুলো নিলামে বিক্রি করার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছি। তিনি বলেন, আমরা দ্রুত এ উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে ফেলতে চাই। প্রত্যেকটি বিমান আলাদা দেশের, কোম্পানির। এ জন্য সময় লাগছে। ইতিমধ্যে কয়েকটির ডি-চেক সম্পন্ন হয়েছে। বাকিগুলোর মধ্যে কোনোটি ঠিক করার মতো আছে কি না, আদৌ করা যাবে কি না তা যাচাই করা হবে। কোনোটি ওড়ানোর মতো উপযোগী কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হবে। নিলামের প্রক্রিয়ার জন্য ফিটনেস যাচাই করে সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হলে যে দেশ থেকে এয়ারক্রাফট আনা হয়, সেখানেও যোগাযোগ করতে হয়। এ প্রক্রিয়াগুলো একটু সময়সাপেক্ষ। এগুলো করার পরে নিলামে তোলা হবে। কাজ অনেক এগিয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কিছু জায়গা ফাঁকা করা হয়েছে। সেখানে ২-৩টি উড়োজাহাজ রাখা যাবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বা সরানোর কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, আমরা এগুলো ফেরত নিতে চাই। কিন্তু বেবিচক ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে পাবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল টাকা মাত্র ৫৬ কোটি, বাকিটা সারচার্জ। এত টাকা তো দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা বেবিচককে জানিয়েছি, মূল টাকা দিয়ে এয়ারক্রাফটগুলো নিয়ে নেব। কিন্তু বেবিচক কিছুই জানায়নি। তিনি বলেন, এর সবই অকেজো হয়ে গেছে। ঠিক করে চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা এগুলো ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারব, যা বেবিচক পারবে না। আমরা এগুলো বিক্রি করে বেবিচকের পাওনা পরিশোধের কথা জানিয়েছি। উদ্বৃত্ত টাকা আবারও এয়ারওয়েজ পরিচালনার কাজে ব্যবহার করতে পারব। বেবিচক এগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করবে। এতে তাদের লাভ হবে না।
এই অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বলেন, গত ৩ জানুয়ারি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা আবারও অপারেশনে আসতে চাই। সে জন্য কর্মপরিকল্পনা দিয়েছি। আমরা সরকারের কাছে বকেয়া মওকুফের আবেদন জানিয়েছি। তা করা হলে এয়ারলাইন্সটাকে আবারও নতুন করে চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনের আগেই এগুলো সরানো হবে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে জিএমজি এয়ারলাইন্স তাদের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট স্থগিত করে। এরপর আর কখনো ওড়েনি এ সংস্থার বিমান। এরপর ২০১৬ সালে বন্ধ হয় দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একমাত্র বিমান কোম্পানি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। ২০২০ সালের মার্চে বন্ধ হয়ে যায় রিজেন্ট, কিন্তু তার আগেই বেশ কয়েকটি রুটে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল সংস্থাটি।
গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে ভ্রমণ কর বাবদ ৩২ কোটি ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩১ টাকা পাওনা রয়েছে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাওনা অপরিশোধিত রয়েছে। অপরিশোধিত পাওনা আদায়ের জন্য তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। সেখান থেকে ১ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৫১২ টাকা আদায় করা হয়েছে।
Leave a Reply