
নিজস্ব প্রতিবেদক:লেখালেখি ও সংগঠক যাপনের চার দশকে জাহান বশীর।যার ৫৫তম জন্মবার্ষিকী ছিল গত ২০ নভেম্বর ২০২৫।বর্তমান সময়ের সব্যসাচী, আবৃত্তিশিল্পী তিনি আর কেউ নন, জাহান বশীর।তাকে কেউ বলেন আবৃত্তির রাজপুত্র, কেউ বলেন বরপুত্র তাঁর কণ্ঠের চর্চা ছিল ১৯৮৮ সাল থেকেই।জাহান বশীরের ৫৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার মিরপুরে মৈতালি শিল্পাঙ্গন,বিশ্বভরা প্রাণ, জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশনসহ কয়েকটি সংগঠন তাঁকে নিয়ে আয়োজন করেছে বিশেষ আবৃত্তির অনুষ্ঠান ‘অনন্ত অমৃতময়’।
সে সুযোগে এস বি নিউজ এর পক্ষ থেকে কথা হলো তাঁর সঙ্গে-
এস বি নিউজ:একাধারে শিশুতোষ লেখক, কবি, আবৃত্তিশিল্পী ও সংগঠক হিসেবেই প্রতিদিনের পথচলা-কিভাবে সম্ভব?
-রেখালেখির শুরু সপ্তম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায়। ১৯৮১ সাল থেকেই। বলা যায় চার দশক। প্রথম দুই দশক ভেবেছি শুধু শিশুদের জন্যই। আমি চাইতাম, মিশুরা শুধু ভূতের গল্প পড়ে বড় হবে কেন? দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে প্রতিনিয়তই মুখোমুখি হতে হয় যেসব বিষয়ে, সেগুলো শিখুক তারা। তাই নিবিষ্ট মনেই তাদের জন্য লিখতে থাকলাম সিরিজ গল্প। পরবর্তীতে সবগুলোই নাটকের চরিত্রের মধ্য দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছি। যেখানে ছড়া, ছড়াগান ও বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়গুলো ফুটে ওঠে। আর তখন থেকেই গণমানুষের সামনে উপস্থাপন করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আবৃত্তিকে বেছে নেওয়া। সংগঠন দিয়ে শুরু না করলে টীম নিয়ে কোথাও তো যাওয়া যাবে না। তাই সাংগঠনিক বিষয়টা স্কুল জীবন থেকেই শুরু।
এস বি নিউজ: এত কিছুর মধ্যে প্রধান্য পায় কোন বিষয়?
-সংস্কৃতি অঙ্গনে কাজ করতে হলে অনেক কিছুই আয়ত্ত থাকতে হয়। শুদ্ধ উচ্চারণ থেকে শুরু করে শুদ্ধ বানানে লেখা, নিজ হাতে কিছুটা আঁকাআঁকির অভ্যেস, সুন্দর করে বলার জন্য কণ্ঠচর্চা করা ইত্যাদি। বর্তমানের জন্যতো সংগঠকদের জন্য গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ক্যামেরা চালনা সবই আয়ত্ত করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। একটি মঞ্চের সুন্দর ডিজাইন অনুষ্ঠানকে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। সুন্দর উপস্থাপনা অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করে। তাই সব কিছুই আমার কাছে মহামূল্যবান।
এস বি নিউজ: সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান থাকা সত্ত্বেও আবৃত্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কি?
-আবৃত্তি হলো- ‘সর্ব শাস্ত্রানং বোধাদপী গরিয়সী’। মানে আবৃত্তি সকল শাস্ত্রের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয়। নিষ্প্রাণ কবিতার ছাপার অক্ষরগুলোকে প্রাণ দেয় আবৃত্তি। গণমানুষের কাছে খুব দ্রুত ও সহজভাবে পৌঁছায়। আর বর্তমানেতো এটি শিল্প হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। একজন আবৃত্তিশিল্পী একটু চেষ্টা করলে নাটক, উপস্থাপনা, সংবাদপাঠ-এসব মাধ্যমে কাজ করতে পারেন। তবে আমি সাংগঠনিক চর্চাকে ব্যাকরণ জানা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। একজন শিল্পী হতে গেলে একক প্রচেষ্টায় নিবিড় অনুশীলনকেই প্রাধান্য দেই।
এস বি নিউজ: আপনার লেখালেখিতে কোন ধরণের বিষয় প্রাধান্য পায়?
-যে কোন মানবিক ইস্যু, সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কারের ইস্যুগুলো। যে লেখা পড়ে একজন শিশুর মানসপটে ভেসে উঠবে সুন্দর পরিবার ও সুন্দর দেশের প্রতিচ্ছবি। সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ হবার বোধ জাগ্রত হয় যে লেখা পড়ে। সেটি বড়দের জন্যও অগ্রগণ্য বলে আমি মনে করি।
এস বি নিউজ: প্রেম, হতাশা, দুঃখ বিগ্রহের লেখাগুলো কিন্তু জনপ্রিয় ।
-হতে পারে।তেবে আমি হতাশবাদী নই। সকল সময়ই আশাবাদী। আশায়ইতো মানুষ বাঁচে।
এস বি নিউজ: সাংষ্কৃতিক সাংগঠনিক চর্চায় আপনার অভিমত কি?
-সাংস্কৃতিক সাংগঠনিক চর্চায় আমার অভিমত সামান্যই। এটি কেবল সৌহার্দ্রপূর্ণ অবস্থান, ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি করা, নাগরিক অধিকারের প্রতি সচেতন হওয়া। নিজের প্রতিভাকে কখনো কখনো জানান দেয়া।
এস বি নিউজ: সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে রাজনৈতিক মূল্যবোধকে আপনি কিভাবে দেখেন?
-কোনকিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। তদুপরি, সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় যদি কোন রাজনৈতিক প্রলোভন থাকে, তাহলে সেটির মূল্য আমার কাছে নেই। তখন তিনি আর সংস্কৃতিকর্মী থাকেন না। তখন মনে হয়, তিনি কারো না কারো অধীনস্ত এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী। তাই আমি পারতপক্ষে কোন সাংগঠনিক ফোরামের মধ্যে থাকি না। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক ধারার অনেক সাংস্কৃতিক ফোরাম কেবল কারো না কারো এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে। একজন সংস্কৃতিকর্মীর কাজ তাঁর সাংস্কৃতিক বিষয়াবলীর সঠিক চর্চা ও বাস্তবায়ন করা। তখন এমনিতেই সবাই মানবিক মানুষ হয়ে উঠবে। সকল ধর্ম,মত নির্বিশেষে সৌহার্দ্য ও সহিষ্ণু পর্যায়ে দেশে বসবাস করতে শিখবে।
এস বি নিউজ: বর্তমানে তরুণদের আবৃত্তি চর্চা নিয়ে কিছু বলুন।-বর্তমানে তরুণরা ভালো আবৃত্তি করার প্রচেষ্টায় রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই সঠিক পথে নেই। মানে প্রাচীন ধ্যান ধারণায় চর্চা চালাচ্ছে। গুরুরা যেমন শিখিয়েছেন,তেমন। অনেকে আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যেরটা দেখে দেখেও শিখছে। সব মিলিয়ে এটা আবৃত্তিশিল্পের জন্য অশনি সংকেত। প্রায় সবার বাচনস্টাইল কাছাকাছি।
এস বি নিউজ: আপনার মতে কি রকম চর্চা হওয়া উচিৎ?
-সর্বপ্রথমে বাংলা ব্যাকরণ আবার রিক্যাপ করা উচিৎ। কবিতার ভাষা থেকে আবৃত্তির ভাষা আলাদা করা দরকার। তার জন্য প্রয়োজন হবে আবৃত্তি নির্মাণ ও প্রক্ষেপণের জন্য নয়টি রসের সুষ্ঠু ব্যবহার। যা ছাড়া পরিচ্ছন্ন সংগীত হয় না, অভিনয় হয় না, নৃত্য হয় না। এমনকি ভালো চিত্রশিল্পীও হওয়া যায় না। ছন্দবদ্ধ ছড়া বা কবিতার জন্য তো ছন্দের মাত্রা, তাল, লয় জানা খুবই আবশ্যক। আমরা যারা প্রশিক্ষক হিসেবে রয়েছি, সর্ব প্রথমে তাদেরকেই এ দায়িত্বটা নিতে হবে। অর্থাৎ আধুনিকোত্তর আবৃত্তির ধারা প্রচলন করতে হবে। তাহলে দর্শক আবৃত্তির প্রতি আকৃষ্ট হবে।
এস বি নিউজ: আপনার লেখালেখি বা গ্রন্থ নিয়ে কিছু বলুন।
-আবৃত্তি শেখার জন্য ছোটদের উপযোগী একটি গ্রন্থ আমি রিখেছিলাম ২০০০ সালে ‘আবৃত্তি শেখো মজা করে”। বর্তমানে রয়েছে ‘নতুন ধারার আবৃত্তি নির্মাণ ও প্রয়োগ’ বিষয়ক গ্রন্থ। আমার এ যাবৎ কবিতার একটি গ্রন্থই প্রকাশ হয়েছে ‘অনার্যনামা”। লেখার চেয়েও আবৃত্তি নিয়েই গবেষণা করতে ভালো লাগে। এমনকি কবিতা নিয়েও পর্যালোচনা করতে পছন্দ করি। ছোটদের জন্য প্রায় পঞ্চাশটির মতো নাটকের গ্রন্থ রয়েছে। প্রকাশ হয়েছে ১০ কি বারোটি।
এস বি নিউজ: আপনার জীবিকা নির্বাহ কিভাবে হচ্ছে?
-জীবনের প্রথমে দৈনিক পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ছিলাম। পরবর্তীতে বিটিভির একটি প্রকল্পের বিভাগীয় সমন্বয়কের চাকুরী। ছিলাম মাছরাঙা প্রোডাকশন ও ধ্বনিচিত্র নামক সংস্থায়। বর্তমানে জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশন রয়েচে আমার। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরণের গ্রন্থ প্রকাশ ও ইমেজমার্ক সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ের উপর তথ্যচিত্র নির্মাণ করছি।
এস বি নিউজ: আমাদের সাথে এতক্ষণ কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ ধৈর্য সহকারে আমার কথা শোনার জন্য।
Leave a Reply