
অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর বঙ্গবাজারে ভয়াবহ আগুন দুর্ঘটনার পর টানা তিন দিন পার হলেও এখনও পুরোপুরি নির্বাপণ ঘোষণা করেনি ফায়ার সার্ভিস। বৃহস্পতিবার এনেস্কো টাওয়ারে থেমে থেমে অপেক্ষাকৃত নিরুত্তাপ আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। স্মরণকালের ভয়াবহ এ আগুনের ঘটনায় জাতীয় সংসদে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। আগুন লাগার পর উত্তেজিত ব্যবাসয়ীরা পুলিশের ওপর হামলার দায়ে অজ্ঞাতনামা ২৫০-৩০০ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এ ঘটনায় গ্রেফতার তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে এক দিন করে রিমান্ড দিয়েছেন আদালত।
এ ছাড়া আগুনের ঘটনায় পুলিশ ও ব্যবসায়ীরা পৃথক সাতটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ ও ছবি তুলেছে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট। এদিকে আগুনের তৃতীয় দিনেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কান্না আর আহাজারি যেন থামছিল না। বাকিতে বেচাকেনার ‘হিসাবের খাতা’ পুড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। বাকি থাকা কোটি কোটি টাকা পাওয়া নিয়ে এখন সীমাহীন দুশ্চিন্তায় দিন যাচ্ছে তাদের। পুড়ে যাওয়া ভবনের সামনে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা রেডিমেড গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানান তারা। তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।
পুরোপুরি নেভেনি এনেস্কোর আগুন: বঙ্গবাজারের আগুন লাগার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুরোপুরি নির্বাপণ ঘোষণা করেনি ফায়ার সার্ভিস। বৃহস্পতিবার ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আগুন নেভানো ও ডাম্পিংয়ের কাজ করে। এনেস্কো টাওয়ারের পঞ্চম তলা থেকে মালামাল সরানোর সময় ছোট ছোট আগুন দেখা যায় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ বলেন, আগুন এখনও সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা যায়নি। দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে। আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। তিনি বলেন, আমরা মূলত এখন ডাম্পিংয়ের কাজ করছি। আগুনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় নিচ থেকে আবারও কিছু জায়গায় ছোট ছোট আগুন জ্বলে উঠছে। পরে সেসব আগুন নেভানো হচ্ছে। ছোট আগুনগুলো পুরোপুরি নেভানো গেলে ফায়ার সার্ভিস সম্পূর্ণ নির্বাপণ ঘোষণা করবে।
সরেজমিন এনেস্কো টাওয়ারে দেখা যায়, আগুন লাগার তৃতীয় দিনেও সেখান থেকে পোড়া ও বেঁচে যাওয়া মালামাল সরানো হচ্ছে। কেউ কেউ ওপর থেকে মালামাল নিচে ফেলছেন, আবার কেউ মাথায় করে নিচে নিয়ে আসছেন। টাওয়ারের নিরাপত্তাকর্মী সালাম বলেন, পঞ্চম তলায় এখনও ধোঁয়া উঠছে, আবার মাঝেমধ্যে আগুনও জ্বলে উঠছে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন সেগুলো নেভানোসহ ডাম্পিংয়ের কাজ করছেন।
থামেনি কান্না-আহাজারি : বঙ্গবাজারে আগুনের তৃতীয় দিনেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কান্না আর আহাজারি করতে দেখা গেছে। এখানকার বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর গ্রামের বাড়ি ঢাকার বাইরে। আগুনের খবর পেয়ে গ্রাম থেকে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা খোঁজখবর নিতে ছুটে আসছেন। তাদের দেখামাত্রই চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরা খোঁজখবর নিতে আসছেন। তাদের পক্ষে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তারা দ্রুত ক্ষতিপূরণসহ সরকারের কাছে পুনর্বাসনের দাবি জানান।
নাজির হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ঈদ উপলক্ষে দোকানে শিশুদের নতুন পোশাক তুলেছিলাম। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। এখন যদি দ্রুত ব্যবসা শুরু করা যেত, তবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হতো। রুবেল মিয়া বলেন, আগুন লাগার তিন দিন আগে ২৫ লাখ টাকার মালামাল উঠিয়েছি। আশা ছিল ঈদে বিক্রি করে সবার দেনা শোধ করে দেব। এখন কীভাবে পাওনা শোধ করব?
বাকিতে বেচাকেনার খাতা পোড়ায় দুশ্চিন্তা: ব্যবসায়ীরা বলেন, এখানকার নিয়ম ছিল, বড় ব্যবসায়ীরা পাইকারিতে ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে বাকিতে পণ্য বিক্রি করতেন। অনেকে আবার ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বাকিতে পণ্য বিক্রি করতেন। সবকিছুর হিসাব ‘বকেয়া খাতায়’ লেখা থাকত। আগুনে সব খাতা পুড়ে যাওয়ায় বড় ব্যবসায়ীরা যেমন বিপাকে পড়েছেন তেমনি ছোট ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। কীভাবে পাওনা টাকা আদায় করবেন, আর কীভাবে শোধ করবেন সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বঙ্গবাজার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও এনেস্কো টাওয়ারের পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, মার্কেট পুড়ে যাওয়ায় বড়-ছোট সব ব্যবসায়ীই এখন দুশ্চিন্তায় আছেন। ব্যবসা না থাকলে টাকা ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তাও থাকে না। তারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের দাবি জানান।
আলামত ও ছবি সংগ্রহ সিআইডির: বঙ্গবাজারে আগুনে পুড়ে যাওয়া এলাকা পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন জিনিসের ছবি তুলেছেন সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে এনেস্কো টাওয়ারের ডান পাশে পুড়ে যাওয়া মার্কেটে সিআইডি ক্রাইম সিনের সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করেন। এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ছয়জনের একটা দল এখানের পোড়া স্তূপ থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করেছি। কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আমরা এখানে ২৪ ঘণ্টা কাজ করছি।
বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডে সংসদে গভীর শোক : বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছে জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের ২২তম ও বিশেষ অধিবেশনে এ শোক জ্ঞাপন করা হয়। অধিবেশনের শুরুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা: প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, রাজধানীর বঙ্গবাজারে আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তালিকা করে সহযোগিতা করা হবে। আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে এ তালিকা করা হবে। এ ছাড়া ঈদের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ব্যবসা শুরু করার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবাজার পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে এসব কথা বলেন।
সালমান এফ রহমান বলেন, ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য কাজ করছি। ইতিমধ্যে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য আমাকে ফোন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। আর্থিক অনুদান পেতে একটি যৌথ ব্যাংক হিসাব, বিকাশ, নগদ, রকেট অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য তাদের পরামর্শ দিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ঈদের আগেই ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ করে দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
রেডিমেড গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দাবি: বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকা রেডিমেড গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুড়ে যাওয়া ভবনের সামনে এসে সংগঠনের ব্যানারে এ মানববন্ধন করেন ব্যবসায়ীরা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আগুনে আমাদের হাজার হাজার দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সবাই পথে বসে গেছি। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। ব্যবসায়ীরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, আমরা নিরুপায় হয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথাযথ আর্থিক সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসন করা হোক।
পুলিশ-ব্যবসায়ীদের সাত জিডি: বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শাহবাগ থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও পৃথক ছয়টি জিডি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
পুলিশের পক্ষ থেকে জিডির তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ। তিনি বলেন, বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় বুধবার একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হামলার ঘটনাস্থল বংশাল থানায়। এ বিষয় তারা দেখবেন।
ব্যবসায়ীদের জিডির বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জন ব্যবসায়ী আলাদা করে জিডি করেছেন। এটা তাদের ব্যবসার ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম করার জন্য। অন্য কিছু না।
ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল সীমিত : অগ্নিকাণ্ডের পর পুড়ে যাওয়া মালামাল হরিলুট শুরু করে ভাসমানসহ সাধারণ মানুষ। বুধবার পোড়া কাপড়-চোপড়সহ ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের গ্রিল, ঝাঁপ, লোহার সিন্দুকসহ এমন কিছু বাদ নেই যে হরিলুট হয়নি। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে বৃহস্পতিবার বঙ্গবাজার মার্কেটের এক পাশের রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয় তারা। এ কারণে এনেস্কো মার্কেটের সামনে থেকে বঙ্গবাজার মার্কেটগামী রাস্তাটিতে চলাচল বন্ধ দেখা গেছে। শাহবাগ থানার এসআই আবদুল্লাহ বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে সর্বসাধারণের যাতায়াত সীমিত করা ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে বঙ্গবাজারের আটটি মার্কেটের ৫ হাজারের বেশি দোকান পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিট সাড়ে ৬ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার ওপরে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
Leave a Reply