
অনলাইন ডেস্ক: উজানে ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা ঢল ও কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টির কারণে বন্যায় দেশের ১১ জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ।
শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণ কমেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বন্যাদুর্গত ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০ হাজার ১৫০ টন।
এ ছাড়া ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। শিশুদের খাবারের জন্য ৩৫ লাখ টাকা এবং গোখাদ্য কেনার জন্য ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা দিতে ৭৭০টি মেডিকেল টিম করা হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, ফেনীতে স্বাস্থ্যসেবা দিতে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। সেটি সেনাবাহিনী ও সিভিল সার্জন কার্যালয় সমন্বিতভাবে পরিচালনা করবে। যারা বন্যাপীড়িত তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি ভি-স্যাট চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, বন্যা-পরবর্তী পানিবাহিত রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বন্যাপীড়িত মানুষদের সরেজমিন চিকিৎসাসেবাসহ অন্য সেবা তদারক করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম ফেনীতে অবস্থান করছেন বলে জানান সচিব।
সংবাদ সম্মেলনে সচিবের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেএম আলী রেজা ও দুর্যোগ অধিদফতরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সচিব বলেন, চলমান বন্যায় চট্টগ্রামে ৫, কুমিল্লায় ৪, নোয়াখালীতে ৩, কক্সবাজারে ৩, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনীতে একজন করে মারা গেছেন। বন্যাকবলিত ১১ জেলার ৭৭ উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়ন ও পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৮৭টি। ১১ জেলায় এখন পানিবন্দি আছে ৯ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৪৯ লাখ ৩৮ হাজার ১৫৯।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেএম আলী রেজা বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে-এ রকম পূর্বাভাস আমরা পেয়েছি। আগামী ২৪ ঘণ্টা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময়ে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের মনু, খোয়াই, ধলাই নদীর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মোট ৩ হাজার ৫২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, সেখানে আশ্রিত লোক ২ লাখ ৮৪ হাজার ৮৮৮ জন। আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ হাজার ৬৯৫টি গবাদিপশু নিয়ে আসা হয়েছে। চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা কার্যক্রম নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, ছাত্র-প্রতিনিধি, বিজিবি-সবাই জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
কোন নদীর পানি বিপদসীমার কত ওপরে : এদিকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শনিবার সকাল ৯টায় দেশের ৬টি নদীর পানি ৯টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছিল। ওই সময় বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের ১১৬টি স্টেশনের মধ্যে ২২টি পয়েন্টে পানি বাড়ার প্রবণতা দেখা গেলেও কমছিল ৮৪ পয়েন্টে আর অপরিবর্তিত ছিল ৪ পয়েন্টে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টায় কুমিল্লায় গোমতী নদীর পানি বিপদসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
খোয়াই নদীর পানি হবিগঞ্জের বাল্লা পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আর মৌলভীবাজার পয়েন্টে মনু নদীর পানি বিপদসীমার ৯১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। চট্টগ্রামের রামগড় স্টেশনে ফেনী নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছিল বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে।
সকালে কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের অমলশীদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, আর শেওলা পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার এবং শেরপুর-সিলেট পয়েন্টে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সুনামগঞ্জের মারকুলী পয়েন্টে এ নদীর পানি বিপদসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। আর ফেনীর পরশুরাম স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেখানকার মুহুরী নদীর বিষয়ে তথ্য দিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড।
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-ধরলা-দুধকুমারের পানি সমতল সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে দেশের কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি, আবার নদ-নদীর বাঁধ ভেঙে পানি বেড়েছে কোনো কোনো এলাকায়। আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন সেসব এলাকার মানুষ। সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের। বন্যার পানিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। সময়ের আলোর প্রতিনিধি ও সংবাদাতাদের পাঠানো খবর-
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বন্যার পানি কমতে থাকায় পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় আখাউড়ার হাওড়া নদীর পানি ২৭ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বন্যার পানিতে বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে এখনও বেশ কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
গত বুধবার থেকে সৃষ্ট বন্যায় আখাউড়া উপজেলার বঙ্গেরচর, কালিকাপুর, বাউতলা, আড়িয়ল ও খলাপাড়াসহ ৪০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার বন্যার পানি বেড়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। তবে ঢলের পানির বেগ কমায় এবং বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার পানি কমতে থাকে। শনিবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়। ইতিমধ্যে বেশিরভাগ বাসাবাড়ি থেকে পানি সরে গেছে। তবে পানি সরে গেলেও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এখনও বন্ধ রয়েছে আখাউড়া স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। পাশাপাশি আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়েও যাত্রী পারাপার বন্ধ রয়েছে।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজালা পারভীন রুহি জানান, আখাউড়ার বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ উন্নতি হচ্ছে। বাসাবাড়ি থেকে পানি সরে যাচ্ছে। দ্রুত ভেঙে যাওয়া বাঁধ ও সড়ক মেরামত করে যান চলাচল ও স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হবে।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টি নেই। তবু বন্যার পানি কমছে না নোয়াখালীতে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ঘরে ফিরতে পারছে না আশ্রয়কেন্দ্রে আসা বানভাসি মানুষ। আবার ঘরে ফিরে গেলে খাবে কী-তা নিয়েও চিন্তায় রয়েছেন তারা। পানি জমে থাকায় কাজকর্ম বন্ধ। উপার্জন নেই বেশ কয়েক দিন। হাতে নেই নগদ টাকা। এ অবস্থায় ঘরে ফিরলেও সেটি স্বস্তির হবে না, এমনটাই বলছে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা পানিবন্দি মানুষরা।
নোয়াখালীতে গতকাল থেকে বৃষ্টি না হলেও বন্যা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। পাশর্^বর্তী জেলা ফেনী থেকে ধেয়ে আসা পানি নোয়াখালীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, নোয়াখালী শহরের অধিকাংশ সড়ক এখনও পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। কোথাও হাঁটু পরিমাণ, আবার কোথাও একটু বেশি, আবার অনেক জায়গায় একটু কম। শহরের বেশিরভাগ বাসাবাড়িতে এখনও বন্যার পানি রয়েছে। জেলার সেনবাগ, সোনাইমুড়ী ও বেগমগঞ্জ উপজেলা সূত্রে জানা যায়, ফেনী জেলা থেকে পানি প্রবাহিত হয়ে এসব এলাকায় ঢুকছে। বৃষ্টি না হলেও পানি কমছে না। এসব উপজেলার বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলার ৮টি উপজেলায় ২০ লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ৫০০টি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন প্রায় ৭৬ হাজার বানভাসি মানুষ। সরকারি বরাদ্দ হিসেবে এ পর্যন্ত ৫০৫ টন চাল ও নগদ ২৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আরও ১ হাজার ২০০ টন চাল ও নগদ ২০ লাখ টাকা প্রস্তুত রয়েছে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ডুবছে গ্রামের পর গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষ। তবে জেলার নাঙ্গলকোট ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কিছু এলাকায় পানি কমে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে; তবে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রীতিমতো মানুষের ঢল নেমেছে। কুমিল্লার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া, নাঙ্গলকোট উপজেলার অনেক বাড়ির পুরো নিচতলাই তলিয়ে আছে। বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছে বাসিন্দারা।
গতকাল দুপুর ১টায় বুড়িচং ও নাঙ্গলকোট উপজেলার ভরাসার, ইছাপুরা, ষোলনল, রায়কোট, মাহিনী মহিষমারা, খাড়াতাইয়া, গাজীপুর ও বাকশীমূল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে যাওয়ায় সড়কপথের যাতায়াত বিঘ্নিত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকার মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ। ফলে তারা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছে হাজার হাজার পরিবার। পানির তীব্র স্রোত এবং নৌকাসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
চুলা জ্বলছে না তাই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন অনেকে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবীরা ত্রাণ তৎপরতা শুরু করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ বানভাসিদের।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাহিদা আক্তার বলেন, বন্যাদুর্গতদের জন্য এ উপজেলায় ৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সকাল পর্যন্ত পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি পরিবার। এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। বাঁধ ভেঙে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের মানুষ। পানি বৃদ্ধি হওয়ায় দুটি আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক খন্দকার মু মুশফিকুর বলেন, বন্যাকবলিত মানুষদের জন্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলছে। দুর্গত এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য শুকনা খাবার, স্যালাইন ও ওষুধ মজুদ আছে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত আছে। আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহীর পদ্মাসহ বিভিন্ন নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। তবে এ অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা নেই। নদীর পানি বিপদসীমার নিচেই আছে। দেশের পূর্বাঞ্চল ডুবে গেলেও রাজশাহী অঞ্চলে এখনও স্বস্তি আছে। তবে ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেওয়া হলে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উত্তরাঞ্চলীয় পানিবিজ্ঞান পরিমাপ বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে।
কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় পানির উচ্চ প্রবাহের ফলে বায়েক ইউনিয়নের শিক্ষা সদন, বায়েক উচ্চ বিদ্যালয়ের মোড়-সংলগ্ন সড়কটি ভেঙে গেছে। এতে কসবা থেকে কুমিল্লা চলাচলের সড়কটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কসবা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহরিয়ার মুক্তার উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, কসবা উপজেলায় ২ হাজার ৩৫০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। তিনটি ইউনিয়নের বন্যাকবলিতদের জন্য ১০ টন চাল ও ৪০০ প্যাকেট শুকনা খাবারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় বন্যার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিপাত বন্ধ হওয়ায় কমতে শুরু করেছে এখানকার পানি এবং নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে বানাভসি মানুষরা। শনিবার সকাল পর্যন্ত উপজেলার হাওড়া নদীর পানি আরও ৪ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে বর্তমানে বিপদসীমার ৫১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বন্যার পানিতে বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে এখনও বেশ কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজালা পারভীন রুহি বলেন, আখাউড়ার বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ উন্নতি হচ্ছে। বাসাবাড়ি থেকে পানি সরে যাচ্ছে। খুব কম সময়ের মধ্যে ভেঙে যাওয়া বাঁধ ও সড়ক মেরামত করে যান চলাচল ও স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। শুক্র ও শনিবার জেলার ৫টি উপজেলায় বন্যার পানির উচ্চতা কিছুটা বেড়েছে। অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি হেলে পড়ায় ও তারে গাছ উপড়ে পড়ার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় প্রায় ২০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন।
কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে জেলার মেঘনা নদীসহ খাল-বিলের পানি বেড়ে গেছে। এতে জেলা সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
এদিকে টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে লক্ষ্মীপুরের প্রায় ৪০ হাজার পুকুর ডুবে চাষের প্রায় সব মাছ ভেসে গেছে। এতে জেলায় মৎস্য খাতে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জেপি চাকমা জানান, রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলার পানি কমতে শুরু করলেও নোয়াখালী সদরের পানির চাপে লক্ষ্মীপুর সদরের দক্ষিণাঞ্চল, কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছ। জেলার ৫৮টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার সবই কমবেশি জলাবদ্ধতা হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৫৭ হাজার লোক পানিবন্দি অবস্থায় আছে। দুর্গত মানুষদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। লোকালয় থেকে পানি ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। এরই মধ্যে ভেসে উঠছে ভয়াবহ বন্যার ক্ষত।সাধারণ মানুষ এসব ক্ষত দেখে চিন্তিত। আজ বা কালের মধ্যে সব পানি সরবে বলে লোকজনের ধারণা।
বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যাকবলিত গ্রামগুলো থেকে পানি নেমে যাওয়ায় নিজ বাড়িঘরে ফিরছে মানুষ। অনেকে ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র পরিষ্কার ও শুকানোর কাজ করছে। পূর্ব ফরহাদাবাদ, নাজিরহাট পৌরসভা, সুয়াবিল, সুন্দরপুর, নারায়ণহাট, দাঁতমারা, বাগান বাজার ও পাইন্দংসহ প্লাবিত নিচু এলাকার বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি দুর্গতদের সেবা দিতে। ত্রাণ বিতরণ ও জানমাল উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন সরাসরি কাজ করছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সেটি তালিকা না করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বন্যায় স্রোতে ভেসে যাওয়া তরুণ মো. এমরানের (২৪) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকালে উপজেলার নারায়ণহাটের মইজ্ঞে পুকুর নামক স্থান থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ওই এলাকার সন্দ্বীপ নগর থেকে নিখোঁজ হন তিনি। এমরান ওই এলাকার সওদাগর পাড়ার তাজুল ইসলামের ছেলে। ফটিকছড়ি ইউএনও এমরানের লাশ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সুত্র:সময়ের আলো
Leave a Reply