
শাহজাহান বিশ্বাস: নাব্যতা সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুট।কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টাই চলছে ড্রেজিং। তিন মাসেও কোন উন্নতি না হওয়ায় মিলছে না ড্রেজিংয়ের কাঙ্খিত সুফল।যে কারণে ফেরি কর্তৃপক্ষ দফায় দাফায় ফেরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।এ পযর্ন্ত মোট ১শ’ ৮৭ ঘন্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল।
এতে একদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা যাচ্ছে পানিতে অপরদিকে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে ফেরি সার্ভিস।ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে ফেরিতে যাতায়াতকারি যানবাহন শ্রমিক ও যাত্রীদেরকে। তিন মাস ধরে ৬টি ড্রেজার দিয়ে ড্রেজিং করেও নৌপথের কোন উন্নতি না হওয়ায় এখানে লোক দেখানো ড্রেজিং চলছে বলে এমটাই মন্তব্য করছেন স্থানীয়রা।
এবার পুরো শুস্ক মৌসুম শুরু হবার আগেই নদীতে পানি কমে ডুবোচরের সৃষ্টি এবং চ্যানেল সরু হয়ে নৌপথ চরম ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যে কারণে ফেরি কর্তৃপক্ষ চলতি মাসের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত তিন বার ফেরি সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। নৌ-চ্যানেলের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে যে কোন সময় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যেতে পারে উক্ত নৌরুটের ফেরি সার্ভিস। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পদ্মা-যমুনায় দ্রুতগতিতে পানি হ্রাস এবং অপরিকল্পিত ড্রেজিং ব্যবস্থার কারণেই আজ আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটের এ দুরাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। তিন মাসের বেশী সময় ধরে ৬টি ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের পরও কি কারণে নৌ-পথ সচল থাকছে না এটাই এখন সচেতন মহলের জিজ্ঞাসা ? এখানে ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কোন গাফলতি, না অপরিকল্পিত ড্রেজিং, নাকি সরকারের ভাব মুর্তি খুন্ন করার জন্য কোন অশুভ চক্র এখানে কাজ করছে তা ক্ষতিয়ে দেখার জন্য সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ফেরি সার্ভিস সচল রাখতে এবং নাব্যতা সংকটের কারণে গত ২৮ জুলাই থেকে তিন মাসের অধিক সময় ধরে আরিচা ঘাটের অদুরে যমুনা নদীতে বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং ইউনিটের নিজস্ব ৬টি ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের কাজ করা হচ্ছে। যা এখনও রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টাই চলমান রয়েছে। এতে ব্যায় হচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। ড্রেজারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। এদের না-খাওয়ার সময় নাই। দেখে মনে হবে এখানে সরকারে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ড্রেজিং বিভাগের এত কর্মযজ্ঞের পরও সাড়ে তিন মাসেও নাব্যতা সংকটের কোন উন্নতি হচ্ছেনা। অবশেষে কর্তৃপক্ষ উক্ত নৌরুটে দফায় দফায় সাময়িকভাবে ফেরি সার্ভিস বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। উক্ত নৌরুটে নাব্যতা সংকটের কারণে গত ১লা নভেম্বর (শুক্রবার) রাত ১০টা থেকে ৩রা নভেম্বর (রোববার ) বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত ৩৭ ঘন্টা এবং গত ৮ নভেম্বর (শুক্রবার) দিবাগত রাত ১১টা থেকে ১১ নভেম্বর (সোমবার) দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৬১ ঘন্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই গত (১৬ নভেম্বর)শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২০ নভেম্বর বুধবার বেলা ১১টা পযর্ন্ত ৮৯ ঘন্টা আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে তৃতীয় বারের মতো ফেরি সার্ভিস বন্ধ ছিল।আজ বুধবার পরিক্ষামুলকভাবে চালু হলেও কতক্ষণ চলে তা বলা মুশকিল। কারণে দ্রুত গতিতে পানি হ্রাসের কারণে উক্ত নৌরুটে নাব্যতা সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।পানি কমে চ্যানেলের অবস্থা দিন দিন একেবারেই শোচনীয় হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় আতোয়ার রহমান বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র যে আটটি ড্রেজার রয়েছে তারা ঠিক মতো কাজ করছেনা। যা করছে তাও আবার অপরিকল্পিত।এরা পাইপ দিয়ে ওজানে যে মাটি ফেলছে সে মাটি স্রোতে গারিয়ে আবার নীচে আসছে। এভাবে অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণেই এ নাব্যতা সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় ফরিদ মিয়া জানান, একমাত্র নদী খননের গাফলতির কারণেই আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।ছোট বেলায় আমরা দেখছি ড্রেজিং করে বালু অনেক দুরে নিয়ে ফেলা হতো।আর এখন কি করতেছে ড্রেজিং করে মাটি দুইশ’ গজ দুরে ফেলছে। এতে জায়গার মাটি আবার জায়গায় এসে পড়ে যা তাই হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে নাব্যতা সংকটের কোন উন্নতি হচ্ছে না।
ট্রাক চালক হামিদ মিয়া বলেন, আমি গত শনিবারে আরিচা ঘাটে আসি ফেরি পার হতে।আজ ৫দিন অতিবাহিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললে তারা শুধু আশ্বাস দিচ্ছে এই যে ড্রেজার দিয়ে নদী কাটা হচ্ছে, নদী কাটা হলেই ফেরি চলাচল শুরু হবে। কিন্তু আসলে যা দেখা যায়, ড্রেজারের লোকজন তারা কাজ না করেই আমাদেরকে শুধু আশ্বাস দিচ্ছে।বেশীর ভাগ সময় ড্রেজার বন্ধ রাখা হয়। তারা ড্রেজার না চালাইয়া আমাদেরকে শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিসি’র আরিচা ঘাটের ম্যানেজার আবু আব্দুলাহ বলেন, গত ১৬ নভেম্বর থেকে তৃতীয় দফায় চার দিন বন্ধ রাখার পর আজ বুধবার বেলা ১১টা থেকে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে পরিক্ষামুলকভাবে ফেরি চলাচল শুরু করেছে।এটা কতক্ষণ থাকবে তা বলা মুশকিল। কারণ নাবত্যা সংকটের তেমন কোন উন্নতি হয়নি। পানি হ্রাস পেয়ে চ্যানেলে পলি পড়া অব্যাহত রয়েছে।বিগত তিন মাসের বেশী সময় ধরে ড্রেজিং কাজ অব্যাহত রয়েছে।কিন্তু এতেও তেমন কোন সুফল মিলছে না।এমতাবস্থায় যে কোন সময় আবার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, আমাদের ড্রেজিং কাজ অব্যাহত রয়েছে।পুরান চ্যানেলের পাশে আমরা আরেকটি নতুন চ্যানেল খননের কাজ শুরু করেছি। এবছর শুরু থেকে এ পযর্ন্ত আরিচা-কাজিরহাট-নগরবাড়ি ও বাঘাবাড়ি পযর্ন্ত ১৭ লাখ ১০ হাজার ঘনমিটার মাটি খনন করা হয়েছে। আরিচাতে মুল সমস্যা হচ্ছে নদীতে প্রচন্ড স্রোত। এ স্রোতের কারণে মাটি কাটার পর ওজান থেকে পলি এসে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যেমন গত মঙ্গলবার মাটি কাটার পর যেখানে পানি ছিল ১৫ ফুট আজ বুধবার সেখানে পলি জমে পানি হয়েছে ১২ফুট। এ নৌরুটের শুধু আরিচা অংশে এই সমস্যা। আর কোন জায়গায় এ রকম হচ্ছে না।স্রোত এবং অব্যাহতভাবে অস্বাভাবিক মাত্রায় পলি পড়ার কারণেই এবার ড্রেজিং করেও নৌপথের নাব্যতা ঠিক রাখা কঠিণ হয়ে পড়ছে।
Leave a Reply