
অনলাইন ডেস্ক: আজ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। এ দিন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় একটি আমবাগানে শপথ নেয় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জেলে থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেহেরপুরে তাৎক্ষণিক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন।
এর পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রী হিসেবে খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে শপথ পড়ান। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর নাম ঘোষণা করা হয়।
মুুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পরামর্শক ও বিশেষ সহায়ক ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদ্যনাথতলা গ্রামের নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর’। মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়েছিল বলে এ সরকার প্রবাসী মুজিবনগর সরকার হিসেবেও খ্যাত।
এই মুজিবনগর সরকারের অধীনেই পরিচালিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল এ সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন আবদুল মান্নান এমএনএ এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী এমএনএ। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে এখানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
তিনি জানান, ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের হাজির করার দায়িত্ব ছিল তার ও আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের তৎকালীন হুইপ আবদুল মান্নানের ওপর। ১৬ এপ্রিল তারা দুজনে মিলে কলকাতা প্রেসক্লাবে যান। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হন।
ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ক্লাবের সেক্রেটারি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ এপ্রিল ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানানো হয়। তাদের বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা তখন জানানো হবে। ১৭ এপ্রিল আমি সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিনীতভাবে বললাম, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবে।
আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহী সাংবাদিকরা গাড়িতে উঠলেন। ৫০-৬০টি গাড়ি নিয়ে আমরা রওনা দিলাম গন্তব্যস্থলের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজন দুই গাড়িতে। আমার গাড়িতে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাদের সঙ্গে অনেক কথা হলো। শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থানে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে পৌঁছাতে বেলা ১১টা বেজে গেল। আমরা পৌঁছার পরপরই অনুষ্ঠান শুরু হয়। ঝিনাইদহ মহকুমার পুলিশপ্রধান মাহবুব উদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেন। মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী শপথ অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।
আগেই ঠিক করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী শপথ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। অনুষ্ঠানের জন্য ছোট্ট একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়। মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যরা, এম এ জি ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি ছিলাম। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এই স্থানের নাম ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল সরকারের রাজধানী।
মুজিবনগর দিবসে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। ঐতিহাসিক এই স্মৃতি-বিজড়িত দিনকে বরাবরের ন্যায় স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সবার সঙ্গে একত্রিত হয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ ও পালন করবে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-আজ সোমবার ভোর ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন, কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং সারা দেশে সংগঠনের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ।
এ ছাড়াও মুজিবনগরের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-ভোর ৬টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে গার্ড অব অনার প্রদান এবং বেলা ১১টায় ‘শেখ হাসিনা মঞ্চে’ মুজিবনগর দিবসের জনসভা হবে। জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব- উল আলম হানিফ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। জনসভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। সঞ্চালনা করবেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক।
এ ছাড়াও বিশেষ বক্তা হিসেবে থাকবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ সদস্য আমিরুল আলম মিলন, পারভীন জামান কল্পনা, অ্যাডভোকেট গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা ও নির্মল কুমার চ্যাটার্জি, মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরহাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক এম এ খালেক।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালন উপলক্ষে দল ঘোষিত কর্মসূচি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোসহ জনগণ ও দেশবাসীর প্রতি দিবসটি আহ্বান জানিয়েছেন।
Leave a Reply