
অনলাইন ডেস্ক: টানা ১০ বছর ৪১ দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিলেন মো. আবদুল হামিদ। এতটা সময় আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে পায়নি বঙ্গভবন । তাই সবচেয়ে দীর্ঘসময়ের এই রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবন পুষ্পস্নানে আড়ম্বরপূর্ণ রাজসিক বিদায় দিয়ে স্মরণীয় করে রাখল।
সোমবার বেলা ১১টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে শপথ নেন তিনি। শপথ মঞ্চে থাকা তিনটি চেয়ারের মাঝের চেয়ারে ছিলেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
তার ডানের চেয়ারে ছিলেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং বামের চেয়ারে ছিলেন স্পিকার। শপথ সম্পন্ন হওয়ার পর চেয়ার বদলের মাধ্যমে (নতুন রাষ্ট্রপতি মাঝের চেয়ারে এবং সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি ডানের চেয়ারে) উত্তরসূরির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সারেন মো. আবদুল হামিদ।
শপথ অনুষ্ঠানের এ আনুষ্ঠানিকতা শেষে টানা দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপতির মেয়াদ সম্পন্ন করা মো. আবদুল হামিদকে বিদায় দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হয়। বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল মাঠে শুরু হয় এ বিদায় পর্ব। বিদায় আনুষ্ঠানিকতায় সবার আগে ঝাণ্ডা হাতে অশ্বারোহী দল, তাদের পেছনে তিন বাহিনীর ব্যান্ড দল বাদ্যযন্ত্রে তুলছিল দেশাত্মবোধক গানের সুর। লাল কাপড়ে মোড়ানো দুটো রশি ধরে দুই সারিতে এ সময় বঙ্গভবনের কর্মীরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন প্রধান ফটকের দিকে। পুষ্পশোভিত এক প্যারেড কারে বাঁধা সেই রশি। খোলা কারে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় নিচ্ছিলেন মো. আবদুল হামিদ ও তার স্ত্রী রাশিদা খানম। দুই পাশ থেকে তখন চলছিল পুষ্পবৃষ্টি। আর এ পুষ্পস্নানে বঙ্গভবনের সবচেয়ে দীর্ঘসময়ের বাসিন্দা মো. আবদুল হামিন বিদায় নিলেন রাষ্ট্রপতির দফতর ও বাসভবন বঙ্গভবন থেকে।
খোলা জিপটি বঙ্গভবনের মূল ফটকে পৌঁছালে সদ্যবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও রাশিদা খানম একটি কালো রঙের গাড়িতে ওঠেন। সেখানে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের তত্ত্বাবধানে মোটর শোভাযাত্রা করে তারা পৌঁছান রাজধানীর নিকুঞ্জে তাদের বাড়ি ‘রাষ্ট্রপতি লজে’।
বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের জীবনালেখ্যতে লেখা ছিল, ‘প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ১৪ মার্চ ২০১৩ থেকে জনাব মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০ মার্চ ২০১৩ তারিখে রাষ্ট্রপতি জনাব জিল্লুর রহমান মৃত্যুবরণ করলে তিনি সে দিন থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২২ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ২৪ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে বাংলাদেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।’
জীবনালেখ্যতে উল্লেখ করা হয়, ‘জনাব আবদুল হামিদ ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২৪ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।’

মেয়াদের বিবেচনায় মো. আবদুল হামিদের পর বেশি সময় বঙ্গভবনের বাসিন্দা ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তবে আবদুল হামিদের মতো সমালোচনামুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি তারা। তাদের মধ্যে সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুই মেয়াদ মিলিয়ে ৬ বছর ১১ মাস ২৬ দিন বঙ্গভবনে ছিলেন। আর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরসহ ৬ বছর ৫ মাস ৭ দিন বঙ্গভবনে ছিলেন। তিনি ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কিছু বিতর্কিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সংবিধানের তোয়াক্কা না করে নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। ফলে দেশে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এ সময় তার কিছু সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংকটকে ঘনীভূত করে। ওই প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। এই অবস্থা দেশে দুই বছর বলবৎ ছিল।
বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুসারে, দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন পর্যন্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে, ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত দ্বিতীয় মেয়াদে এবং ১৯৭৩ সালের ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ওয়েবসাইটে দেওয়া সাবেক রাষ্ট্রপতিদের তালিকা অনুসারে দেশের চতুর্থ রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত’ ছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ১৫ আগস্টেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন খুনি মোশতাক আহমাদ। ওইদিনই তিনি রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সপ্তম রাষ্ট্রপতি ছিল খুনি মোশতাক। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম নবম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১৯৭৮ সালের ১২ জুন পর্যন্ত সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ১৯৭৮ সালের ১২ জুন থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেকে ১৯৮১ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তিনি ১৯৮১ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দিন, ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত আবদুর রহমান বিশ্বাস , ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ২০০২ সালের ২১ জুন পর্যন্ত একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্পিকার ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার (রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত), ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এবং ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ২০ মার্চ পর্যন্ত মো. জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি ছিলেন। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply