
অনলাইন ডেস্ক: দশ মাসের শিশু আরিয়ান শেখ। জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গরমে ঘাম থেকে ঠান্ডা লেগে শিশুটির জ্বর ও কাশি হচ্ছে। ধীরে ধীরে তা নিউমোনিয়ার দিকে যাচ্ছে। শিশুটির বাবা সুরুজ মিয়া বলেন, গরমের কারণে চার দিন আগে প্রথমে জ্বর হয়। পরে খিঁচুনি শুরু হলে এখানে ভর্তি করা হয়। কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। শ্বাসকষ্টের জন্য কিছুক্ষণ পরপর নেবুলাইজার দেওয়া হচ্ছে। প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে কিছুক্ষণ পরপর বমি করছেন। ছেলের অবস্থা সহ্য করার মতো নয়। চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া সব বন্ধ। প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে ভালো চিকিৎসা করানো যেত কিন্তু আমাদের অভাব-অনটন আর টানাটানির সংসার। এত টাকা কই পাব। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন তিনি।
হাসপাতালে শুধু এই বাচ্চা নয়, পাশের ২০৮ নাম্বার রুমে চোখে-মুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ নিয়ে একমাত্র শিশু আবদুল্লাহকে নিয়ে শুয়ে আছেন যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা বেবি আক্তার। তিনি জানান, শনিবার রাতে হঠাৎ করেই জ্বর, পাতলা পায়খানা, বমি শুরু হয়। প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। পরে অবস্থা খারাপ হলে এখানে ভর্তি করা হয়। বাচ্চা এখনও ঠিকমতো খাচ্ছে না। শুধু কান্নাকাটি করে। এখানে তিন দিন ধরে ভর্তি কিন্তু শয্যা না থাকায় মেঝেতেই চিকিৎসা চলছে। এখানে খুব গরম আর যে অস্বাস্থ্যকর অবস্থা। মনে হচ্ছে আমার বাচ্চার শরীর দিন দিন আরও দুর্বল হচ্ছে। ছেলের মুখের দিকেও তাকাতে পারছি না। এতটুকু ছোট বাচ্চারে নিয়ে হাসপাতালে আসা খুবই কষ্টের। যা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু এই দুই শিশু নয়, পুরো শিশু ওয়ার্ডজুড়েই ভয়াবহ অবস্থা। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরাও।
একদিকে জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা গরম। অন্যদিকে রাত আর দিনে সমানতালে চলছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি মিলছে না। দিন ও রাতের গুমোট গরম বেশি পড়ছে শিশুদের ওপর। সরেজমিন রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে অসহনীয় গরমের কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। এ ছাড়াও বর্তমানে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ রোগী আউটডোরে গরমজনিত কারণে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে গরমজনিত ডায়রিয়া, জ্বর, স্ট্রোকের রোগী আছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে শিশুদের শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, পেটের সমস্যা, হাঁপানি, সর্দি, জ্বর-কাশি বেশি হচ্ছে, যেটা ভাইরাল ফ্লু। এ ছাড়াও টাইফয়েড ও পানিবাহিত হেপাটাইটিস এবং জন্ডিসের প্রবণতা বেড়েছে। কারণ তাপদাহের কারণে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সি মানুষের শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয়ে পানিশূন্যতা সৃষ্টি তৈরি হচ্ছে। ফলে হিট স্ট্রোকের মতো বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। গরমে রোগবালাই থেকে সুরক্ষায় বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান করা, ফলমূলের শরবত পান, পচা-বাসি ও বাইরের খাবার না খাওয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ার পরামর্শও দেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢামেক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, হাসপাতালে শিশু বিভাগের ৫টি রুমে শিশুদের সেবা দেওয়া হয়। এর মধ্যে সোমবার প্রতিটি রুমে ৮০-১০০ জন শিশুদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশই ছিল গরমের কারণে। শিশুদের শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, হাঁপানি, সর্দি, জ্বর-কাশি ডায়রিয়াজনিত সমস্যা। আর ৩০ শতাংশ ছিল টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার এবং বাকি ৩০ শতাংশ ছিল ডেঙ্গু, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, নানা ধরনের অ্যালার্জিতে আক্রান্ত। আর হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ রোগী সেবা নিয়ে থাকেন। তীব্র তাপদাহের কারণে গত কয়েক দিন বহির্বিভাগ থেকে ৬০০-৭০০ বেশি রোগী সেবা নিচ্ছেন।
ঢামেক হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডের ২০৭ ও ২০৮ নাম্বার রুমে মোট শয্যা রয়েছে ৩৮টি। কিন্তু রোগী ভর্তি আছে এর চেয়ে তিনগুণ বেশি। এর মধ্যে ঠান্ডাজনিত সর্দি-জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডের রোগী বেশি ভর্তি। হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় পাটি, কাঁথা-বালিশ বিছিয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ও তাদের স্বজনসহ অসংখ্য মানুষ শুয়ে-বসে রয়েছেন। সেখানেই চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বেশি রোগী থাকায় হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মো. শাহেদুর রহমান সোহাগ বলেন, গরমের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে রোগীরা আসছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ শিশুর সর্দি-জ্বর, হাঁপানিতে আক্রান্ত। এ ছাড়া টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার রোগীও তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এখন আমরা গড়ে প্রতিদিন ৬শর বেশি রোগী দেখছি কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে যেখানে এর অর্ধেক রোগী আসত। তাতেই বোঝা যাচ্ছে রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের রোগীর তুলনায় শয্যা কম, তাই সবাইকে ভর্তি করা সম্ভব নয়। যাদের অবস্থা খুব খারাপ তাদের ভর্তি করা হচ্ছে আর যাদের সমস্যা কম তাদের পরামর্শ দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
Leave a Reply