
অনলাইন ডেস্ক: দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়ংকর হচ্ছে। রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকলেও নগরায়ণের ফলে এখন তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের ৫৬ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ পৌনে দুই গুণ বাড়লেও ঢাকায় বাইরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ।
শুক্রবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১৮২ জন। আক্রান্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭২ জন এবং ঢাকার বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১০ জন। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়, আক্রান্ত হন ৬৬১ জন। এই নিয়ে চলতি মাসের সাত দিনে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৩২০ জন। আর এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। এ ছাড়া চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৬৫ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ২৯৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪২৮ জন। এর আগের সপ্তাহে ঢাকার বাইরে আক্রান্ত ছিল ৪৫৫ জন। আর এ সময়ে ঢাকার বাইরে রোগী বেড়েছে তিনগুণ। এই সময়ে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে পৌনে দুই গুণ। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে ঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ পানি জমছে। ফলে মশার বংশবৃদ্ধি ঘরেও হচ্ছে বাইরেরও হচ্ছে। এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মশা যত বাড়বে ডেঙ্গুর প্রকোপও বাড়বে। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সর্বমোট ২ হাজার ১৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার ৫৩টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৫৮ জন। আর অন্যান্য বিভাগে ভর্তি রয়েছেন ৬৩৭ জন। এ ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৫৭ জন ভর্তি রয়েছেন। এরপরই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৮১ জন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল ১০৬ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৬৪ জন, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ৫৫ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ জন ভর্তি রয়েছেন। রাজধানীর বাইরেও বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা।
সিলেট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হঠাৎ করে সিলেটে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও এ পর্যন্ত কারও মৃত্যু হয়নি। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলা, জাফলং পর্যটন এলাকা ও তার আশপাশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। আর আক্রান্তদের অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা ও যাদের সম্প্রতি কোনো ভ্রমণ ইতিহাস (ট্রাভেল হিস্ট্রি) নেই। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, সিলেটের বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের মাধ্যমেই জাফলংয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু জ্বর। এ অবস্থায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, গত জানুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৭৯ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ২৩ জন নারী এবং ৫৬ জন পুরুষ রয়েছেন। বিভাগে গত দুই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৭৩ জন। যেখানে জুন মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৯ জন আর এ মাসের ৬ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ জন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, এ মাসের শুরুতেই সিলেট নগরীর ২৬ নং ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। মাসের প্রথম থেকেই এডিস মশা নিধনে বিশেষ কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশক নিধন অভিযান অব্যাহত আছে।
এদিকে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী জানান, মূলত সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং, সাহেববাজার, ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। ১ মে থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে ২৪ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আরও কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
খুলনা ব্যুরো জানিয়েছে, খুলনায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের পরপরই ডেঙ্গু রোগীরা হাসপাতালে আসতে শুরু করেছেন। রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ এবং এদের ৯০ ভাগই ভ্রমণকালে আক্রান্ত হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ইউনিট খোলা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ১৯ জন এবং খুলনা সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু ইউনিটে ১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি নেই খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি)। সম্প্রতি কেসিসি নির্বাচন হয়েছে, এখন মেয়রের দায়িত্বে কেউ নেই। এ ছাড়া খুলনা শিশু হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা।
খুলনা শিশু হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আল আমিন রাকিব জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তবে এখানে ডায়াগনোসিসের ব্যবস্থা আছে। বেশিরভাগ শিশু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যায়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরএমও ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, ঈদের আগেই আমরা ডেঙ্গু ইউনিট চালু করেছি। ইউনিটে মোট বেড ৩৪টি। এর মধ্যে শিশুদের ২টি, পুরুষদের ১৬টি এবং মহিলাদের ১৬টি। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৯ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ জন পুরুষ।
রাজশাহী ব্যুরো জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১ জন রোগী চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানা গেছে।
রামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম আহমেদ জানান, আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। সেখানেই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রামে প্রায় ৫০০ মশার প্রজননক্ষেত্র থেকে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু। যেগুলোকে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২টি মশার প্রজননস্থল রয়েছে চসিকের ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ডে। চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উদ্যোগে পরিচালিত জরিপে এসব প্রজননস্থল চিহ্নিত করা হয়। আর এসব প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে মাঠে নামছে চসিক।
শুক্রবার চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম মাহী বলেন, চট্টগ্রামে মশার প্রজনন এবং ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বিবেচনায় ৪৯১টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মশক নিধনে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এখন মশার হটস্পটগুলোতেও ওষুধ ছিটানো হবে। মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
এদিকে জ্বরে আক্রান্ত সন্দেহজনক রোগীদের বিনামূল্যে ডেঙ্গু টেস্ট করাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জেনারেল হাসপাতাল। সদরঘাটস্থ এ হাসপাতালে আগামী সোমবার থেকে বিনামূল্যের এ টেস্ট সুবিধা চালু হবে।
শুক্রবার চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে ডেঙ্গু টেস্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply