
অনলাইন ডেস্ক: জনপ্রিয় একজন ইউটিউবার আটকে আছেন ধ্বংসস্তূপে। সেখানকার অন্ধকার থেকেই ভিডিও বার্তা দিয়ে উদ্ধারের মিনতি জানিয়েছেন তিনি। কেউ কেউ ভয়েস মেসেজে জানাচ্ছেন বাঁচার আকুতি। আর যাদের কাছে এমন কোনো ডিভাইস নেই, তাদের সম্মিলিত চিৎকার ভেসে আসছে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে। তুরস্ক আর সিরিয়ায় চাপা পড়া অসংখ্য প্রাণ এভাবেই আর্তনাদ করছে বাঁচার জন্য। বাঁচাতে মরিয়া উদ্ধারকারীরাও। ‘ভেতরে কেউ আছেন কি’; এভাবেই ধ্বংসস্তূপে জীবনের সন্ধান করছেন তারা। তবে আফটারশক আর বৈরী আবহাওয়ায় এই কাজে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
এদিকে মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে এই খবর লেখার সময় সরকারি হিসেবে দুই দেশে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কা, মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান দুর্গত এলাকায় তিন মাসের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। উপ-রাষ্ট্রপতি ফুয়াত অকতাই মঙ্গলবার সকালে জানিয়েছেন, সে দেশে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪১৯ জনের মৃত্যু শনাক্ত হয়েছে। আহত হয়েছে ২০ হাজার ৫৩৪ জন। অন্যদিকে সিরিয়ার হিসেবে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০২ জনে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫ হাজার ২১ জনের মৃত্যু শনাক্ত হয়েছে।
তুরস্ক-সিরিয়ায় মানবতার এই আর্তনাদ কাঁদাচ্ছে সারা বিশ্বকে। উদ্ধার অভিযানে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশের মানুষ দুর্গত এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিভিন্ন দেশ সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।
ধবংসস্তূপে জীবনের আর্তনাদ : সোমবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজারো মানুষের মতো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন তুরস্কের এক ইউটিউবার। ধ্বংসাবশেষের নিচে থাকা অবস্থাতেই তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ভিডিওতে তিনি নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মাকে বের করতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। ইস্তানবুলে তুরস্কের এক সাংবাদিক ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করেছেন বিবিসি নিউজ চ্যানেলে। বলেছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে লোকজন ভয়েস মেসেজ পাঠাচ্ছে। ইব্রাহিম হাসকোলোগলু নামের এই সাংবাদিক বলেন, ‘মানুষ এখনও ভূমিকম্পে ধসে পড়া বাড়িঘরের নিচে চাপা পড়ে আছে। তাদের সাহায্য দরকার।’ বিবিসি নিউজ চ্যানেলকে তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লোকজন তাকে এবং অন্যান্য সাংবাদিকদেরকে ভিডিও, ভয়েস মেসেজ পাঠাচ্ছে এবং তাদের অবস্থান জানাচ্ছে।
এএফপি বলছে, অসংখ্য মানুষ বাঁচার জন্য মরিয়া। তারা আর্তচিৎকার করছে। কিন্তু তাদের জীবিত উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ছে। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা, তুষার ও বৃষ্টি উদ্ধারকাজে বাধার সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধারকারীরা সময়মতো তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। এ কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়ায় রাতে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার মধ্যেই তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হতাইয়ে একরাশ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া এক নারীর কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল, সাহায্য চেয়ে ডাকছিলেন তিনি। কাছেই প্রাণহীন এক শিশুর দেহ পড়ে আছে। এই নিরাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে দেনিজ বলে পরিচয় দেওয়া স্থানীয় এক বাসিন্দা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন, হতাশায় হাত মোচড়াচ্ছিলেন তিনি।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা দেনিজ উদ্ধারকারীদের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কাঁদছিলেন। পরে অবশ্য তাকে উদ্ধার করা গেছে। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন সেই অভিজ্ঞতা। দেনিজ বলেন, ‘তারা (আটকে পড়া মানুষ) সবাই সাহায্যের আশায় শব্দ করছে, কিন্তু কেউ সেখানে যাচ্ছে না। আমরা বিধ্বস্ত হয়ে গেছি। সবাই সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে। তারা সবাই বাঁচতে চাইছে, কিন্তু তাদের বাঁচাতে পারছি না। সকাল থেকে সেখানে কেউ নেই।’
উদ্ধার অভিযানে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকারীরা : ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি আর আবহাওয়া এতটাই প্রতিকূল যে উদ্ধারকাজে নেমে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলো। যেমন তুরস্কের বেসরকারি উদ্ধারকারী সংস্থা একেইউটি। সোমবারের ভূমিকম্পকে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করছেন সংস্থাটির সমন্বয়কারী মুরাত হারুন অনগোরেন। তিনি বলেন, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল অংশজুড়ে ধ্বংসলীলা চলেছে, রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ, তারপর আবার আবহাওয়া এত ঠান্ডা যে জমে যাওয়ার মতো। এতে উদ্ধারকারীদের সেখানে পৌঁছাতে বড় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
প্রতি ঘণ্টা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া লোকজনের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন মুরাত হারুন। তবে তিনি এ-ও বলেছেন, এত বিপর্যয়কর একটি ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মানুষের কাছে পুরো সাহায্য পৌঁছানো সহজ বিষয় নয়। এই সময়ের মধ্যে উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় আনা, তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং লজিস্টিক-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সাজানো বেশ কঠিন একটি কাজ।
উদ্ধারকাজ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে কথা বলেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগানও। তার ভাষায়, প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে, তারপর ভূমিকম্পটা হয়েছে রাতে। এতে সবকিছু আরও জটিল হয়ে গেছে। এরপরও সবাই সবকিছু উজাড় করে দিয়ে মানুষকে সাহায্য করছেন।
তবে উদ্ধার তৎপরতায় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ গোনুল তোল। তিনি বলেন, ‘আমি খুবই ক্ষুব্ধ। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষ ভালোবাসার ব্যক্তিদের বের করার চেষ্টা করছেন। এদিকে শীতও পড়েছে, বৃষ্টি হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ নেই। এরই মধ্যে পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করতে লোকজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্ধারকারীদের জন্য অপেক্ষা করছেন।’
এদিকে বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত উত্তর সিরিয়ায় সোমবার সারা রাত ধরে উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। তাদের একদল ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে হতাহতদের বের করতে হাত লাগিয়েছে। আরেক দল বৃষ্টির মধ্যে লোকজনের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা তুলে ধরতে গিয়ে সিরিয়ার উদ্ধারকারী দল হোয়াইট হেলমেটসের মুখপাত্র ওবাদাহ আলওয়ান বলেন, ‘ভূমিকম্পটা হলো সবচেয়ে খারাপ এক সময়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। এখন বৃষ্টি হচ্ছে। আর আমাদের সহকর্মীরা হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।’
হোয়াইট হেলমেটসের কাছে উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং সেগুলো চালাতে জ্বালানি তেলের ঘাটতি রয়েছে বলে জানালেন ওবাদাহ আলওয়ান। এতে পুরোদমে উদ্ধারকাজ চালানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় জরুরি অবস্থায় এগিয়ে আসার মতো বলতে গেলে শুধু হোয়াইট হেলমেটসই রয়েছে। আর আমরা একটি বেসরকারি সংস্থা। তাই এই পর্যায়ের বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য অবশ্যই আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকার কথা নয়।’
এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন দেশ : ভূমিকম্পের পর তুরস্ক ও সিরিয়াকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন দেশের সরকার। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি উদ্ধারকাজের জন্য দরকারি সরঞ্জাম পাঠাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। প্রতিশ্রুতি এসেছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তুরস্ক বলছে, ৪৫টি দেশ থেকে তারা সহায়তার আশ্বাস পেয়েছে। আর সিরিয়া সরকারের ভাষ্য, বিদেশ থেকে আসা সাহায্য দেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে তারা। তবে এ ক্ষেত্রে সমস্যার বিষয়টি হলো, সিরিয়া সরকারের দেশের সব অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই।
উদ্ধারকাজে যোগ দিতে মানুষের ভিড় : আলজাজিরা জানিয়েছে, বিদেশে থাকা তুরস্কের নাগরিকদের কেউ কেউ উদ্ধার অভিযানে যোগ দিতে দেশে ফিরছেন। যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষ সহায়তা দিতে ভিড় করছেন। এদিকে তুরস্কের ইস্তানবুল বিমানবন্দর এলাকায় হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছেন। তারা সবাই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যেতে চান।
স্থানীয়দের বরাতে বিবিসি বলছে, তারা ভূমিকম্পের পর সাহায্য করার জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে যাওয়ার জন্য জড়ো হয়েছেন। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত ১০ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে চেয়েছেন। সেখানকার উদ্ধারকাজে সহযোগিতার জন্য তারা ইস্তানবুল বিমানবন্দরে ভিড় করছেন।
Leave a Reply