
শাহজাহান বিশ্বাস:মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কালিগঙ্গা নদীর দুই তীরে শনিবার বিকেলে ছিল উৎসবের আমেজ। ‘নদী দূষণ রোধ করি, নির্মল বাংলাদেশ গড়ি’ এই প্রতিপাদ্যে কালিগঙ্গা নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর দর্শকদের উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় নদীর তীর পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
শুধু মাঝি-মাল্লাদের লড়াই নয়, এই আয়োজনকে ঘিরে নদীর দুই পারে বসেছিল লোকজ মেলা। পিঠা, হস্তশিল্প, খেলনা ও স্থানীয় খাবারের দোকানগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। নৌকাবাইচ উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন নদীর দুই পারের বেউথা, চর বেউথা, আন্ধারমানিকসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজবাড়ী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা নৌকাবাইচ দেখতে আসেন।
নৌকার প্রতিযোগিতার সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাসও সমান তালে এগিয়েছে। নদীর দুই তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল হাজারো মানুষ। কেউ চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছিল, কেউবা হাততালি দিয়ে মাঝিদের মনোবল বাড়াচ্ছিল। অনেকে আবার নৌকা ভাড়া করে মাঝনদী থেকে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেছেন।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, একসময় বর্ষাকালে নিয়মিত নৌকা বাইচ হতো। আজকের আয়োজন তাদের পুরনো দিনের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে। কালীগঙ্গার বুকে আজকের বৈঠার ছন্দ যেন প্রমাণ করল গ্রামীণ ঐতিহ্য এখনও বেঁচে আছে, শুধু তাকে নিয়মিতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন।
বেউথা এলাকার বাসিন্দা নাহার-ই-জান্নাত বলেন, ‘আমরা ঢাকায় থাকি। বাইচের খবর শুনে পরিবার নিয়ে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।’
হরিরামপুর উপজেলার আসাদুজ্জামান বলছিলেন, তিনি এখন ঢাকা থাকেন। নৌকা বাইচ দেখতে মানিকগঞ্জ এসেছেন৷ ৫০-৬০ বছর আগে তার বাড়ি পদ্মায় ভেঙে গেছে। তখন বাইচে ‘ময়ূরপঙ্খি নাও’ সাজিয়ে অনেক আনন্দ করতেন বলেও জানান আসাদুজ্জামান।
সাভারের কুরগাঁও এলাকার শুভ বলেন, “এর আগেও বাইচ দেখেছি। তবে ২৫-৩০টি নৌকার বাইচ আগে দেখেননি।” বন্ধুদের সঙ্গে মানিকগঞ্জে এসে বাইচ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
দৌলতপুর উপজেলার বাসিন্দা মামুন মিয়া পলাশ বলেন, তিনি ঢাকার মিরপুরে থাকলেও প্রতি সপ্তাহে দৌলতপুর যাতায়াত করেন। জীবনে অনেকবার বাইচ দেখলেও সম্প্রতি বাইচ দেখেননি।
তিনি বলেন, “এতো নৌকা হবে ভাবতে পারিনি। এ আযোজনের জন্য জেলা প্রশাসকসহ আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।”

ঘিওর উপজেলা থেকে বাবার সঙ্গে প্রথম বাইচ দেখতে আসা ছোট্ট শিশু সেহান বলেন, নানা রকম নৌকা দেখে খু্ব ভালো লেগেছে।
বাইচে জয়ী দল শেরে বাংলা ভিটেপাড়া বাইচের নৌকার মালিক সালেক মেম্বার বলেন, “আমরা অনেকগুলো প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এবার মানিকগঞ্জেও চ্যাম্পিয়ন হলাম। খুবই ভালো লাগছে।”
পুলিশ সুপার মোসাম্মৎ ইয়াসমিন খাতুন বলেন, নৌকাবাইচের সময় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সেনা সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন।
নৌকা বাইচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ড. মনোয়ার হোসেন মাল্লা বলেন, “নৌকা বাইচের চেয়ে বড় বিনোদন আর কিছু নেই। নৌকা বাইচ আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। আমরা চাই পরবর্তী প্রজন্ম এই আনন্দময় উৎসব উপভোগ করুক।”
জেলা বিএনপি’র আহবায়ক আফরোজ খানম রিতা বলেন, মানিকগঞ্জে যে কয়টি উৎসব আছে তার মধ্যে এই নৌকা বাইচ একটা অন্যতম উৎসব ছিল, দীর্ঘ সময়ের ব্যাবধানে আবার সেই উৎসবটা ফিরে আসছে। এটা মানিকগঞ্জবাসীর জন্য অনেক আনন্দের। যে কারণে এখানে লক্ষ লক্ষ লোক সমবেত হয়েছে।যেটা শুরু হয়েছে এর ধারাবাহীকতা ধরে রাখতে হবে। আমরা যেন প্রতিবছরই এই নৌকা বাইচের আয়োজন করতে পারি।
প্রতিযোগিতায় যে ২৩টি নৌকা অংশ নেয় এর মধ্যে ছিপা, ছান্দি, ঘাসি ও খেলনা জাতের নৌকা অন্যতম। চারটি রাউন্ড শেষে চূড়ান্ত পর্বে পাবনা জেলার সাঁথিয়ার সালেক মেম্বারের নেতৃত্বাধীন শেরে বাংলা ভিটেপাড়া দল চ্যাম্পিয়ন হয়। সন্ধ্যায় বিজয়ী দলকে ট্রফি ও একটি মোটরসাইকেল পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা।
বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা, পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন, জেলা বিএনপি’র আহবায়ক আফরোজা খানম রিত এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
Leave a Reply