
অনলাইন ডেস্ক: জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বুধবার অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রলম্বিত আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার চর্চা বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
জেনেভার বরাতে ঢাকায় অবস্থিত জাতিসংঘের কার্যালয় বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈশ্বিক এই সংস্থার বিশেষজ্ঞরা বলেন, “আমরা এ বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন যে, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা দৃশ্যত তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।”
বাংলাদেশের বৃহত্তম দৈনিক সংবাদপত্র প্রথম আলোতে কর্মরত রোজিনা ইসলাম ২০২১ সালে কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা উপকরণ সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে প্রতিবেদন করেন। ২০২১ সালের ১৭ মে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যান। সেখানে অবস্থানকালে বিনা অনুমতিতে কোভিড ১৯ এর টিকা ক্রয় সম্পর্কিত সরকারি নথিপত্রের ছবি সেলফোন ব্যবহার করে তোলার দায়ে তাঁকে অভিযুক্ত ও আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেসি আইন এবং দণ্ডবিধির আওতায় মামলা দায়ের করা হয়। ৩ জুলাই ২০২২ তারিখে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে, যেখানে বলা হয় রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাত মাস পরে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করা এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই একই আদালত পুলিশকে অধিকতর তদন্ত চালাতে নির্দেশ দেয়। পরবর্তী শুনানিটি ২৪ ফেব্রুয়ারি হবার কথা।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেন, “বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনার– যা প্রায়শই ভিত্তিহীন– এবং পরে সেই সব মামলার মীমাংসা না করে ঝুলিয়ে রাখার বিপদজনক প্রবণতাটিরই প্রতিফলন রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলায় এই দীর্ঘসূত্রিতার বৈশিষ্ট্যটি। তাঁদেরকে হুমকি দেওয়া, ভয় দেখানো, হয়রানি করা এবং তাদেরকে চুপ করিয়ে দেয়ার উপায় হিসেবে এটা ব্যবহার করা হয়”।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, “অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থামিয়ে দিতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করতে এবং সেলফ-সেন্সরশিপের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে বিচার ব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিৎ নয়।“ সরকারের প্রতি পরামর্শ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, “সরকারের উচিৎ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক আইনি কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করা, একইসাথে, ঔপনিবেশিক আমলের দাপ্তরিক গোপনীয়তার আইন এবং সাম্প্রতিককালের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একইসাথে সরকারের উচিত দেশের আইন এবং তার প্রয়োগকে মানবাধিকার রক্ষায় দেশটির আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।”
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, স্বাধীন, সেন্সরশিপবিহীন এবং অবাধ গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে এবং সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে ঝুলিয়ে রাখা আর সব মামলা তুলে নিতে বিশেষজ্ঞবৃন্দ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, প্রায়শই জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য, হয়রানি এবং সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয় বলে নারী সাংবাদিকেরা দ্বিগুণ ঝুঁকিতে থাকেন। তাঁরা আরো বলেন, “সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি আমরা। দেশটির কর্তৃপক্ষকে যে কোনো কারিগরি পরামর্শ এবং সহযোগিতা দিতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।” এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন এই বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা হচ্ছেন: আইরিন খান, মত প্রকাশ ও প্রচারের অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, মেরি ললর, মানবাধিকারকর্মীদের অবস্থা বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, রিম আলসেলাম, নারী ও নারী শিশুদের প্রতি সহিংসতার কারণ ও পরিণতি বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, মার্গারেট স্যাটাথুয়েট, বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার।
Leave a Reply