
অনলাইন ডেস্ক: শুরু হয়েছে দেশে ধানের প্রধান মৌসুম বোরো কাটার উৎসব। ইতিমধ্যে বেশ কিছু এলাকায় আগাম বোরো ধান কর্তন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে এখন বোরো ধানের ঝিলিক। একবারই ধানচাষ হয় হাওর অঞ্চলে। সেটা বোরো মৌসুমে। হাওরপারের কৃষকদের সারা বছরের খাদ্যের জোগান আসে এ ধান থেকে। শস্যভাণ্ডার খ্যাত হাওর জেলাগুলোর অবারিত মাঠজুড়ে এখন সোনালি ধান। ফলন ভালো হওয়ায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় হাসির ঝিলিক কিষান-কিষানির চোখেমুখে।
নতুন ধানের ম ম গন্ধে ভরে উঠেছে হাওর এলাকার গৃহস্থ ঘর। এদিকে এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং পর্যাপ্ত সার ও কীটনাশক পাওয়ায় বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশে এবার ৪৯ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের জন্য ধান আবাদ করা হয় ১৩ লাখ হেক্টরের বেশি, উফশী জাতের ধান ৩৬ লাখ হেক্টরের বেশি এবং স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করা হবে শূন্য দশমিক ১৭৬ লাখ হেক্টর জমিতে। এসব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এবার মোট বোরো আবাদ হয়েছে ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর জমিতে।
গত ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ লাখ ৭২ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ৪৯ লাখ ৫১ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৯ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টন। গত বছরের তুলনায় এ বছর বোরো আবাদে জমির পরিমাণ বেড়েছে ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর। আর চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টন। যা গত বছরের তুলনায় ১ লাখ টন বেশি।
এদিকে চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় বোরোর পৃথক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টরেরও বেশি বোরো ধান।
বোরো আবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এবার আমরা জমি আবাদের পরিমাণ বাড়িয়েছি। একই সঙ্গে উচ্চ ফলনশীল জাত, হাইব্রিড এবং আগাম আসে এমন জাতের ওপর গুরুত্ত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের আগাম জাতের ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করেছি।
অপরদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে মাথাপিছু দৈনিক ৪০৭ গ্রাম চাল ধরে কৃষি বিভাগ দেশে চালের চাহিদা নির্ধারণ করে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টন। তবে তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ বিআইডিএসের মূল্যায়নে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৭১ লাখের ওপরে। সে ক্ষেত্রে দেশে বছরে চালের চাহিদা প্রায় পৌনে ৪ কোটি মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বিবিএস সূত্র বলছে, সর্বশেষ বছরে দেশে সবচেয়ে বেশি বোরো ধানের চাল উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ১ লাখ টন, আমন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টন এবং আউশ উৎপাদন হয়েছে ২৯ লাখ টন। যদিও এরপরও ১৫-১৯ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয় খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ায় চাহিদা আরও বাড়ছে। এ কারণে আমদানি করতে হয় প্রতি বছর।
সুনামগঞ্জ জেলার কিছু কিছু হাওরে স্বল্পপরিসরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে ধান কাটা পুরোদমে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন অনেক কৃষক। এ জেলায়তেও ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় কিছু হাওরে ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা দেখার হাওর, শিয়াল মারা এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি হাওরে কৃষক ধান কাটছেন। কথা হয় শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাংহাই হাওয়ারে মজিদ মিয়ার (৪২) সঙ্গে। তিনি জানান, সাংহাই হাওরের ১০ ‘কেদার’ জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছেন। কিন্তু মাত্র ৩ কেদার জমির ধান পেকেছে। সেগুলো এখন কাটছেন তিনি। আগামী সপ্তাহে সব ধান পেকে যাবে বলে তিনি জানান।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়াল মারা হাওরে কথা হয় কৃষক আলিমুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ১২ কেদার বোরো জমিতে ধান লাগিয়েছেন এ বছর। ধান পুরোপুরি পাকেনি। কিছু জমির ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কাটছেন। এক সপ্তাহ পরে পুরোপুরি ধান পাকবে।
সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন জানান, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় এখনও পুরোপুরি ধানকাটা শুরু হয়নি। আগামী সপ্তাহে পুরোপুরি ধানকাটা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল জানান, এখনও পুরোপুরি ধান কাটা শুরু হয়নি হাওরে। কিছু কিছু জায়গায় স্বল্প পরিসরে ধান কাটছেন কৃষক। আগামী বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ধান কাটা উদ্বোধন করা হবে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে আগাম জাতের মাঠের পাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষকরা। ধানের আশানুরূপ ফলন হওয়ায় কিষান-কিষানির চোখে-মুখে দেখা দিয়েছে আনন্দের ঝিলিক। বর্তমানে বাজারে ধানের দাম নিয়েও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন কৃষকরা।
দুই উপজেলায় আগাম জাতের বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। শনি ও রোববার সকালে উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর উনিয়নের সুখাড় গ্রামে ও মধ্যনগর বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের টাংগুয়ার হাওর পারে রংচী গ্রামের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিচ্ছিন্নভাবে কৃষকরা মাঠে পেকে যাওয়া আগাম জাতের সোনালি ধান কাটছেন কৃষকরা।
জানা যায়, এবার ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় আগাম জাতের বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বেশিরভাগ জমির ধানই পাকতে শুরু করেছে। ধান ঘরে তুলতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন কৃষকরা। এদিকে ব্রি-২৮ ধানে ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণ নিয়ে অনেক কৃষকের মাঝে আতঙ্ক রয়েছে।
টাংগুয়ার হাওর পারের রংচী গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া ও সুখাইড় গ্রামের কৃষক জয়দেব চন্দ্র সরকার বলেন, চলতি বছরে তিনি প্রায় ১ একর জমিতে স্বর্ণা-৫ জাতের ধান লাগিয়েছেন। ৯০ ও ৪৯ জাতের ধানগুলো আগাম জাতের হওয়ায় বর্তমানে কৃষকরা সেগুলো কাটা শুরু করেছেন।
তিনি আরও বলেন, বাজারে স্বর্ণা-৫সহ অন্যান্য সাধারণ জাতের ধান মণপ্রতি ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রয় না হলে কৃষকের কোনো লাভ থাকবে না। ধানের স্বাভাবিক ফলন ধরে রাখার জন্য প্রতি সপ্তাহে ১ বিঘা জমিতে প্রায় ৭০০ টাকার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। বাজারে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে তাদের পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। কৃষকরা যাতে ধানের উপযুক্ত মূল্য পান সে বিষয়ে কৃষকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ৩১ হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। চাষকৃত এসব ধানের মধ্যে রয়েছে ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ২৯, ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ৮৯, ব্রি ধান ৯২ এবং হাইব্রিডের মধ্যে জনক রাজ, ছক্কা, তেজগোল্ড, মাইক্রো ১, ইস্পাহানি ৮, রুপালি ৭ ও স্বর্ণা ৩ জাতের ধান। চলতি বছরে মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হোসেন আল বান্না বলেন, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ৩১ হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ আবাদ হয়েছে। আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন হাওরে ৪১০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি অফিস। কয়েক দিন পর পুরোপুরি ধান কাটা শুরু হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালোভাবে ধান ঘরে তুলতে পারবেন বলে জানান কৃষকরা।
নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় ইরি-বোরো আবাদ হয়ে থাকে। জেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান উৎপাদন করে জীবন-জীবিকা ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচসহ সার্বিক ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। এর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হাওরপারের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। হঠাৎ অকাল বন্যায় হাওরের ফসলহানি হয়ে গেলে বিপাকে পড়ে যান কৃষকরা। তাই আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে শতভাগ পাকার আগেই ধান কাটতে শুরু করেন কৃষকরা। এ বছর ফলন ভালো হলেও বিআর-২৮ ধানে ব্ল্যাস্ট রোগে ফসলের সামান্য ক্ষতি হয়েছে। অনুকূল পরিবেশ থাকলে ভালোভাবে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পারবেন বলে জানান কৃষকরা।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১০ উপজেলায় এ বছর ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার মধ্যে অর্জিত হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমি। শুধু হাওরেই আবাদ হয়েছে ৪০ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমি। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৩ মেট্রিকটন। ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৬৮ হেক্টর জমি।
খালিয়াজুরী উপজেলার কৃষক শফিকুর রহমান জানান, হাওরে এ বছর বোরো ফসল ভালো হয়েছে। ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে বিআর-২৮ ধান সামান্য নষ্ট হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ২০ দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে সুন্দরভাবে হাওরের ফসল ঘরে তোলা যাবে। তবে হাওর উপজেলা- মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, আটপাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলায় খবর নিয়ে দেখা গেছে, গুটিকয়েক এলাকায় ধান কাটা শুরু হলেও কাঁচা থাকায় এখনও পুরোপুরি কাটা শুরু হয়নি।
জেলা কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আবাদ হয়েছে বোরোর। ফলনও হয়েছে ভালো। হাওর এলাকায় কিছু কিছু জমিতে ধান কাটা শুরু হয়েছে। কয়েক দিন পরে পুরোপুরিভাবে কাটা শুরু হবে। ধান কাটতে কৃষকদের হারভেস্টার মেশিন দেওয়া হয়েছে। এতে দ্রুত ধান কাটতে পারছেন কৃষকরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সুন্দরভাবে ধান ঘরে তুলতে পারবেন তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com