অনলাইন ডেস্ক: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে যমুনা নদীতে পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, কাজীপুর, বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলায় ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে।
ভাঙনের তাণ্ডবে গত দুই সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এ চার উপজেলার অন্তত দেড় শতাধিক বাড়িঘর, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, শত শত গাছপালা ও কয়েকশ বিঘা ফসলি জমি। ভাঙনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুর ও পাঁচিল গ্রামে, চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া, ঘোড়জান ও উমারপুর ইউনিয়নে এবং কাজীপুর উপজেলার কিছু অংশে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ বলছে, এনায়েতপুর স্পার বাঁধ থেকে শাহজাদপুর উপজেলার পাঁচিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদীর পারজুড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে পাউবো, তাতে গাফেলতির খেসারতই এবার দিতে হচ্ছে যমুনাপাড়ের হাজার হাজার মানুষকে।
সর্বশেষ শুক্রবার সকালেও কাজিপুরের যমুনা নদীর মেঘাই ১ নম্বর সলিড স্পার এলাকায় অন্তত ৩০ মিটার অংশ ধসে গেছে। বাঁধটি পুরোপুরি ধসে গেলে এ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অপরদিকে যমুনায় পানি বাড়ার ফলে প্লাবিত হতে শুরু করেছে চরের নিম্নাঞ্চল। তলিয়ে যাচ্ছে চরাঞ্চলের একের পর এক ফসলি জমি। এদিন সকালে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৮২ মিটার। এই পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ সেন্টিমিটার। অপরদিকে কাজিপুর মেঘাই ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ সেন্টিমিটার।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, যমুনায় পানি বৃদ্ধির ফলে চৌহালী উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরনাকালিয়া, বিনানই, চরসলিমাবাদ, ঘোড়জান ইউনিয়নের ফুলহারা, মুরাদপুর, চরধীতপুর, উমারপুর ইউনিয়নের বাউশা, মিনিদা ও ধুবলিয়া গ্রামের নদীভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বাসিন্দারা। অনেকেই গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টাঙিয়ে অতিকষ্টে বসবাস করছেন এরই মধ্যে।
চর সলিমাবাদ গ্রামের বৃদ্ধ আবদুল লতিফ বলেন, ‘ছোট থেকেই নদীভাঙন দেখছি। বৃদ্ধ হয়ে গেছি কিন্তু আজও নদীভাঙন রোধ হয়নি। জমিজমা ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন নিঃস্ব। অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে কোনো মতে বসবাস করছি।’ সম্প্রতি শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুর ও পাঁচিল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সাম্প্রতিক নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো অসহায় মানুষজন অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকে আবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য দ্রুত ঘর ও আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। পুরো এলাকায় এখন ভাঙন আতঙ্ক।
জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর স্পার বাঁধ থেকে শাহজাদপুর উপজেলার পাঁচিল পর্যন্ত সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদীর পারজুড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। এরপর টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে ২৬টি প্যাকেজে গত বছরের মার্চ মাস থেকে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ধাপে ধাপে কাজ চলমান থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই কাজ বন্ধ রাখেন ঠিকাদাররা। এ ছাড়া প্রকল্পের কাজ শুরুর আগের সাড়ে তিন বছরে যমুনা নদীর এই সাড়ে ৬ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের সময় জরুরি ভিত্তিতে ১০-১২ কোটি টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হয়।
ভিটেমাটি হারানো নদীপারের মানুষের অভিযোগ, প্রায় এক বছর হলো নদীপারে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে বাস্তবে কাজের অগ্রগতি তেমন নেই। যদি শুষ্ক মৌসুমে কাজ করা হতো তা হলে কিছুটা হলেও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। নদীপারে ভরাট করে রাখা শত শত বালুভর্তি জিও ব্যাগ ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে, সেগুলোও সময়মতো পারে ফেলতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে সঠিক সময়ে নদীপাড়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ না হওয়ায় এবারও যমুনার তীব্র ভাঙনে ভিটেমাটি হারাতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে।
নদীভাঙনের জন্য এসব এলাকার মানুষ এখন দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের। তাদের দাবি, সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু না করার কারণেই নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
শাহজাদপুর উপজেলার পাঁচিল গ্রামের বাসিন্দা কোরবান আলী ও জহির হোসেন বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে যমুনার ভাঙনে আমাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে প্রকল্পের ঠিকাদাররা অল্প কিছুসংখ্যক জিও ব্যাগ ফেলছে। তাছাড়া নদীপারে স্তূপ করে রাখা প্রায় ৩০০ বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
একই এলাকার মির্জা সরকার ও আবদুল আলীম বলেন, ‘দুদিন আগেও আমাদের বাড়িঘর সব ছিল। আর আজ আমরা পথে বসে গেছি। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে আমরা এখন ভাসমান মানুষ।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিলটন হোসেন বলেন, এনায়েতপুর স্পার বাঁধ থেকে শাহজাদপুর উপজেলার পাঁচিল পর্যন্ত ৬৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদীর পারজুড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরুর পরপরই বন্যার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আবারও বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। মালামালের দাম বৃদ্ধি ও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে বাঁধ নির্মাণকাজ কিছুটা পিছিয়েছে।
ভাঙনের সার্বিক বিষয় তুলে ধরলে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।’
কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম বস্তা ফেলা হচ্ছে এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর স্পার বাঁধ থেকে শাহজাদপুর উপজেলার পাঁচিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদীর পারজুড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় যে পরিমাণ বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা দরকার সে পরিমাণ বস্তা ফেলতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগবে। এক মৌসুমে তো আর এত বড় প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব না। আগামী জুন মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com