
অনলাইন ডেস্ক: যমুনা নদীকে ঘিরে এক অদ্ভুত প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ১১০ কোটি টাকা ব্যয় করে নদীটির দুই পাড় সরু করাসহ বেশ কিছু কাজ হাতে নেওয়া হচ্ছে। তবে অবাস্তব কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় শুরুতেই প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব ৭১ কর্মকর্তা থাকার পর পরামর্শক খাতে ২১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা, অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়-এমন অনেক বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে প্রকল্পে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে জৈববৈচিত্র্যের ধ্বংসের বিষয়টি আমলে না নিয়ে নদীর দুই পাড় সঙ্কুচিত করে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের এই অদ্ভুত বিষয়গুলো সম্পর্কে ঘোর আপত্তি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞ হিসাবে এই প্রকল্প সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া তাহলে পানি সম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত অভিমত দিয়েছিলেন, এই প্রকল্পে অনেক বিষয় আছে-যা অবান্তর। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নদীর দুই পাড়ের প্রশস্ততা কমাতে ব্যবহার করা হবে টপ ব্লক পারমিয়েবল গ্রোয়েনস (টিবিপিজি) প্রযুক্তি। যা এই প্রকল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে আপত্তি জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, পিইসি সভায় আমি ছিলাম সেখানে আমার আপত্তির কথা তুলে ধরেছি। নদী সংকুচিত করে নদীকে মেরে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। টিবিপিজি নির্মাণ এই প্রকল্পের জন্য অনুপযুক্ত। এই স্টাডিতে টার্মস অফ রেফারেন্সটি (টিওআর) ত্রুটিপূর্ণ এবং এই স্টাডির জন্য প্লাবন সমভূমিকে বিবেচনা করতে হবে।
প্রকল্পের আওতায় অভিজ্ঞতা লাভের জন্য এক্সপ্লোজার ভিজিট হিসেবে রাইন, দানিউব ও মিসিসিপি নদী রাখা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা এছাড়া বিদেশ প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সে জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিদেশ প্রশিক্ষণে মোট ব্যয় হবে ১১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এই তিন নদীর মধ্যে রাইন ও দানিউব নদীর নব্যতা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই দুই নদীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে অনেক বন্দর বন্ধও হয়ে গেছে। এ বিষয়ে ড. আইনুন নিশাত বলেন, যমুনা নদীর সঙ্গে এই তিন নদীর কোন মিল নেই। এই বিষয়ে যদি অভিজ্ঞতা লাভের জন্য যেতে হয় তাহলে আমাজন বা কঙ্গ নদী উপযুক্ত।
নদীর প্রশস্ততা কমাতে গ্রোয়েন বা বালুর বস্তা ফেলে নদীতে বাঁধ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অথচ সমজাতীয় আরেকটি প্রকল্পে বাঁধ নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা এ নিয়ে পিইসি সভায় প্রশ্ন তুলেছেন অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি। তিনি এই রেট কমিয়ে আনতে বলেছেন। এছাড়া প্রয়োজন ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। একই সাথে এই মোটরযান, জলযান ক্রয় বাবদ ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা বাদ দিতে বলা হয়েছে।
যুগ্ম প্রধান (সেচ) বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পে যমুনা নদীকে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার সংকীর্ণ করতে কত বছর সময় লাগবে তার হিসেব নেই। টিবিপিজির মাধ্যমে নদী সংকোচনের ফলে যে সমস্ত এলাকায় নদী প্রবাহ থাকবে না এসব এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং এসকল এলাকায় কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং জৈববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে যমুনা নদীর ডাউনস্ট্রিমের পরিবেশ এবং যমুনা সেতু ও পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য স্থাপনার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে কিনা তা সেই বিষয়গুলোও তারা জানায়নি। এগুলো জানা প্রয়োজন।
সভায় ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, প্রকল্পে প্রিমিয়াম ভর্তুকি খাতে ক্ষতিপূরণ খাতে ২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং সুরক্ষা তহবিল খাতে ক্ষতিপূরণ ২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। খাত দুটি পরিচালনার ক্ষেত্রে পরামর্শক নিয়োগ বাবদ ২৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে যা অযৌক্তিক। তিনি আরও বলেন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলো হলো, পুরো যমুনা নদীকে চ্যানেলাইজড করা, নতুন একটি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা, প্রযুক্তিটি সফল হলে পরবর্তীতে বড় কোন প্রকল্প গ্রহণ করা। প্রস্তাবিত প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সাথে নদী পাড়ে অবস্থিত পরিবারগুলোর মাঝে ভর্তুকি প্রদান, প্রটেকশন ফান্ড প্রদান এবং পরামর্শক নিয়োগ কার্যাবলী অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়।
এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ছাড়পত্র নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বলেন, প্রকল্পে এ প্রকল্পে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ছাড়পত্র নেয়া হয়নি। প্রকল্পে ৫০০০ গাছ লাগানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, গাছগুলো কোথায় লাগানো হবে এবং কি ধরণের গাছ লাগানো হবে তা ডিপিপিতে তা উল্লেখ করতে হবে।
প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হলেও একাডেমিক ভবন ও আন্তর্জাতিক নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, একাডেমিক ভবন ও আন্তর্জাতিক নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরে সভায় একাডেমিক ভবন ও আন্তর্জাতিক নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে সর্বমোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এই কার্যক্রমের সাথে সম্পর্ক নেই প্রকল্পের আওতায় ভিলেজ প্লাটফর্ম তৈরি বাবদ ৩৯ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং এই প্লাটফর্মকে জিও ব্যাগের মাধ্যমে রক্ষা বাবদ ১৪ কোটি ১৮ লাখ টাকার সংস্থান রয়েছে। সভায় এই বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে পরে তা বাদ দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন কাজের জন্য ৮৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পরামর্শক খাতে ২১৯ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে আপত্তি উঠেছে সভায়। সভায় বলা হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্ল্যানিং উইং-এ নিজস্ব ৭১ জন কর্মকর্তা রয়েছে। এছাড়াও পাউবো ইতোমধ্যে যমুনা নদীতে সমধর্মী বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় তাদের কর্মকর্তাদের এ ধরণের কাজে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে তারপরও এত পরামর্শকের কোন প্রয়োজন নেই।
প্রকল্প প্রস্তাবের নথি গেটে দেখা যায়, ‘যমুনা রিভার সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট-১ রিভার ব্যাংক প্রোটেকশন অ্যান্ড রিভার ব্যাংক ট্রেইনিং (কম্পোনেন্ট-১) অ্যান্ড ডিজেস্টার রিস্ক ফিনান্সিং (কম্পোনেন্ট-৩) শীর্ষক প্রকল্পটির উদ্যোগ নিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সহযোগী হিসেবে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এবং সহযোগী হিসেবে থাকবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১০৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকার দিবে ২১৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বিশ^ব্যাংক এআইআইবি, নেদারল্যান্ড সরকার এবং জিআরআইএফ দিবে ৮৯৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ কুড়িগ্রাম ও জামালপুর অঞ্চলে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে , পারমিয়েবল গ্রোয়েন নির্মাণ ২টি (নির্বাচিত স্থান ফুলছড়ি ও কালিহাতি উপজেলা)। নদী তীর সংরক্ষণ : ফুলছড়ি২.৪৩ কিলোমিটার কালিহাতী ১.৬২৫ কিলোমিটার( পারমিয়েবল গ্রোয়েন নির্মাণ করা হবে এই দুই স্থানে)। নদী ড্রেজিং ৭.০৬৫ (কালিহাতি উপজেলা)। একাডেমিক ভবন-২ নির্মাণ; ৫০০০ বৃক্ষ বনায়ন। মাস্টারপ্লান প্রণয়ন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com