
নিজস্ব প্রতিবেদক: মানিকগঞ্জ শহরের ৮৮ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির ডালপালা এখন আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। এর আগেও এক অনুসন্ধানে ক্যাচমেন্ট এরিয়া জালিয়াতির তথ্য উঠে আসলেও এবারের অনুসন্ধানে মিলেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। তথাকথিত এই ‘সেরা’ স্কুলের ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ঠিকানাই ভুয়া। প্রমোশন না নিয়ে বছরের পর বছর একই স্কুলে জেঁকে বসা একদল শিক্ষক, প্রশ্নবিদ্ধ ভর্তি পরীক্ষা এবং ‘স্পেশাল ব্যাচ’ নামক নতুন এক কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতি মাসে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অর্ধকোটি টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮৮ নং স্কুলের প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থীকে পশ্চিম দাশরা ৬ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা দেখানো হলেও বাস্তবে মাত্র ৫% শিক্ষার্থীর স্থায়ী ঠিকানা সেখানে। তথ্যমতে, ওই এলাকায় এত বিপুল সংখ্যক ভাড়াটিয়া থাকার মতো বাড়ি বা রুমের অস্তিত্বই নেই যা ট্যাক্সের আওতাভুক্ত। অথচ, সিংগাইর, শিবালয় , ঘিওর, সাটুরিয়া,হরিরামপুর বা দৌলতপুর থেকে আসা ৯৫% শিক্ষার্থীকেই স্থানীয় বাড়ির বিদ্যুৎ বিলের ফটোকপি ব্যবহার করে ‘ভুয়া ভাড়াটিয়া’ সাজিয়ে ভর্তি করানো হয়েছে।
বিদ্যালয়টিতে এমন কিছু শিক্ষক রয়েছেন যারা ক্যারিয়ারের স্বার্থে প্রমোশন পাওয়ার যোগ্য হলেও অদৃশ্য কারণে তা নিচ্ছেন না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রমোশন নিয়ে অন্য স্কুলে গেলে তাদের রমরমা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। এই সিন্ডিকেটে সরাসরি অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে শিক্ষক রুহুল আমিন, দিলরুবা, সালমা, গোবিন্দ এবং আনোয়ারের নাম। এছাড়া প্রেষণে (ডেপুটেশন) এসে স্থায়ী হওয়া কামরুন নাহার, সাদিয়া মান্নান, মৌসুমী ও কানিজ নামের শিক্ষকরা এই চক্রের সক্রিয় সদস্য।
জানা গেছে, জানুয়ারি মাসে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য সরকারি বই দেওয়ার নামে শিক্ষার্থীদের থেকে ২২০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। প্রথম শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষা এবং ভর্তি বাণিজ্যে মূল ভূমিকা পালন করেন কামরুন নাহার ও কানিজ। ৩য় শ্রেণীর দায়িত্বে থাকেন সাদিয়া মান্নান। শিশু শ্রেণী দায়িত্ব রয়েছে মৌসুমী ।
অভিযোগ আছে, ভর্তির সুযোগ পাওয়ার প্রধান শর্তই হলো— বছরের শুরুতে ওই নির্দিষ্ট শিক্ষকদের কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া। যারা প্রাইভেটে পড়তে সম্মত হন, কেবল তারাই ভর্তির টিকেট পান। উল্লেখ্য সরকারি ভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এদিকে, সপ্তাহের ছয় দিন কোচিং চললেও বন্ধের দিন শুক্রবারকে বানানো হয়েছে ব্যবসার প্রধান দিন। বিদ্যালয়টির সিনিয়র শিক্ষক রুহুল আমিন ‘স্পেশাল ম্যাথ ব্যাচ’ নামে মাসে মাত্র ৪ দিন পড়িয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন পুরো মাসের বেতন।
একইভাবে ‘স্পেশাল ইংলিশ ব্যাচ’ নামে চলছে রমরমা ব্যবসা। প্র্যাকটিস মেকস এ ম্যান পারফেক্ট—প্রবাদটিকে উপেক্ষা করে সপ্তাহে মাত্র একদিন পড়িয়ে কি করে ভাল রেজাল্ট সম্ভব? অভিযোগ উঠেছে, সেবার পরিবর্তে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি থেকে শুক্রবারেও শিশুদের রেহাই দিচ্ছে না এই শিক্ষক নামধারী ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, সরকারিভাবে শতভাগ উপবৃত্তি বিধান চালু থাকলেও অন্য বিদ্যালয় থেকে আসার ফলে প্রায় ৪০% শিক্ষার্থী উপবৃত্তি স্থানান্তরের ঝামেলায় উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই স্কুলে প্রাত্যহিক সমাবেশ বা অ্যাসেম্বলি হয় না। ক্লাসের পড়ার সময় নষ্ট করে দায়সারা ভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষকের আশীর্বাদপুষ্ট শিক্ষকেরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো রুটিন তৈরি ও পরিবর্তন করেন এবং টিফিনের সরকারি সময়ও মানা হয় না।
এদিকে, এত বড় দুর্নীতির খবর প্রচার হলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হয়নি বলে জানা গেছে। শহরের তালতলায় দশ বারোটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা।
সংবাদ প্রকাশের পরও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনও দেখা যায়নি। এমনকি বিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডেও কোনো তদন্তের নোটিশ নেই।
তবে অনুসন্ধানকালে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সকল দফতরই এ ব্যাপারে উপযুক্ত তদন্ত করে ব্যবস্থাগ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।
সচেতন মহলের মতে, এই শিক্ষকদের বদলি নয়, বরং সরাসরি জুডিশিয়াল ইনভেস্টিগেশন প্রয়োজন। অন্যথায়, ‘চুরির শিক্ষা’য় বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম জাতির কপালে কলঙ্কের তিলক এঁকে দেবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com