অনলাইন ডেস্ক: কয়লা সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রার প্রথম ইউনিট। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১ থেকে দেড়শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কয়লা সংকটে যাতে কেন্দ্রটি বন্ধ না হয়ে যায় সে জন্য উৎপাদন কমানো হয়েছে। তারপরও জুনের ৩ বা ৪ তারিখে বন্ধ হয়ে যাবে দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদনও।
এর মূল কারণ হচ্ছে ডলার সংকটে কয়লা আমদানির বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পারা। বকেয়া আংশিক পরিশোধ করে কয়লা আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে এলসি খোলা হবে। কয়লা আসতে ২৫ দিনের মতো লাগবে। তাই জুন মাসের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকবে কেন্দ্রটি। এতে রাজধানীসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোডশেডিং বাড়বে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬ মাসের বিল বকেয়া ২৯৮ মিলিয়ন (২৯ কোটি ৮০ লাখ) মার্কিন ডলার বা ৩ হাজার ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৬ টাকা ৫০ পয়সা ধরে)। কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিএমসি চিঠি দিয়ে বলেছে, টাকা না দিলে কয়লা সরবরাহ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের বারবার চিঠি দিয়েও প্রায় ৩০ কোটি ডলার পায়নি বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। গত ২৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে ২৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার বরাদ্দ চেয়েছিল বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডলার না পাওয়ায় কয়লা আমদানি শুরু করা যায়নি।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ কেন্দ্র। এই কেন্দ্রের প্রতিদিন ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ মাত্র ৭.৫ টাকায় বিক্রি করে থাকে। গড়ে দেশের দৈনিক মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ জোগান দেয় এই সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এই কেন্দ্রটির ওপর নির্ভরশীল।
পিডিবি সূত্র জানায়, পায়রা থেকে এখন জাতীয় গ্রিডে ১ থেকে দেড়শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। কয়লা সংকটের কারণে দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন কোনোরকমে চালু রাখা হয়েছে। আর ৪ থেকে ৫ দিন চলতে পারে। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই সংকটের কারণে এই কেন্দ্র থেকে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো না। দ্বিতীয় ইউনিটে ৬০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদিত হতো।
সূত্র আরও জানায়, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর বরিশাল বিভাগে লোডশেডিং ন্যূনতম পর্যায়ে চলে আসে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর ওই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ খুলনা ও ঢাকা বিভাগে সরবরাহ করা হতো।
সেটি বন্ধ হয়ে গেলে ঢাকার বিদ্যুৎ কমিয়ে সেখানে সরবরাহ করতে হবে। এতে ঢাকা শহরে লোডশেডিং বাড়বে। আবহাওয়া শুষ্ক হলে লোডশেডিং বাড়বে।
পায়রার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ খাতের জন্য চরম আঘাত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে রাজধানীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেবে। এর বিকল্প হিসেবে অতিমূল্যের তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই।
তিনি বলেন, আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে, জ্বালানি খাতকে আরও সংকুচিত করা দরকার। ডলার যাতে কম খরচ হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। তার জন্য যা যা করা দরকার তাই করতে হবে।
এ বিষয়ে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, কয়লা সংকটে ২৫ মে বন্ধ হয়ে গেছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন কমানো হয়েছে। যা কয়লা আছে তা দিয়ে এটি ৩ বা ৪ জুন পর্যন্ত চালানো যাবে। এরপর দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হব।
তিনি বলেন, রোববার কয়লা আমদানির বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা কথা বলেছেন। বকেয়া বিলের আংশিক পরিশোধ করা হয়েছে। এখন কয়লা আমদানিতে কোনো বাধা নেই। সোমবার থেকেই এলসি করা যাবে। শুধু এলসি খুললেই হবে না, জাহাজ পোর্টে যেতে হবে, এতে সময় লাগবে। যারা কয়লা দেবে তাদের মজুদ থাকতে হবে, সেটা পোর্টে আনতে হবে, জাহাজে লোড করবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে কয়লা দেশে আসতে প্রায় ২৫ দিন লাগবে। ততদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ রাখতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
এতে লোডশেডিং বাড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব তো কিছুটা পড়বেই। এই কেন্দ্রের কিছু বিদ্যুৎ ঢাকায়ও আসত। এতে ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব কিছুটা পড়তে পারে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করবে পিডিবি।
বারবার চিঠি দেওয়া হলেও ডলার কেন দেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কিছু নেই। আমরা চিঠি দেওয়ার পর সংশ্লিষ্টরা চেষ্টা করেছেন। দেশে ডলার সংকট রয়েছে। ১০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে একসঙ্গে এত ডলার দেওয়া কঠিন। পায়রা ছাড়াও অন্য স্টেকহোল্ডারদেরও ডলারের প্রয়োজন রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব হাবিবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বকেয়ার অংশ বিশেষ পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাঝখানে অল্প কয়েক দিনের গ্যাপ (বন্ধ হতে পারে) থাকতে পারে। পায়রা বন্ধ থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের চেষ্টা হচ্ছে বন্ধ না করে অল্প পরিমাণ উৎপাদন করে কেন্দ্রটি সচল রাখা।
প্রসঙ্গত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য মাসে ৩ লাখ মেট্রিকটন কয়লা প্রয়োজন হয়। তবে এ কেন্দ্র বন্ধ হলে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি খারাপ হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com