
অনলাইন ডেস্ক: প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবনের সঙ্গে যোগ হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং। রাজধানীতে দিন এবং রাত মিলিয়ে ৬ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। আর ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি আরও খারাপ। কোনো কোনো এলাকায় ১০ ঘণ্টারও বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত বিদ্যুতের কোনো সুখবর নেই। ৩ বছর আগে উৎপাদনে আসার পর এই প্রথম কয়লা সংকটে ২৫ মে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের সবচেয়ে বড় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই সংকটের কারণে এই কেন্দ্র থেকে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো না। দুই ইউনিটে ৬০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদন হতো। এখন ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিটে উৎপাদন হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এটিও আজকালের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। কয়লার জন্য এলসি করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষ দিকে কয়লা এলে আবারও উৎপাদনে আসবে কেন্দ্রটি। দেশের চাহিদার ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো কেন্দ্রটি থেকে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
পিডিবি সূত্র জানায়, গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। এখন তাপপ্রবাহ চলায় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এখন গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পায়রার প্রথম ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটতি বেড়েছে, পুরোপুরি বন্ধ হলে ঘাটতি আরও বাড়বে। তেলভিত্তিকে কেন্দ্র চালিয়ে ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। আর উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৩৩৪ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ৩৬৬ মেগাওয়াট। শুক্রবার বন্ধের দিন দুপুর আড়াইটায় চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ হয়েছে ১১ হাজার ৯৬০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ১ হাজার ৪৭১ মেগাওয়াট।
সূত্র বলছে, বাস্তবে সারা দেশে লোডশেডিং হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। গরম না কমলে আর পায়রা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে লোডশেডিং আরও বাড়বে।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা রায়হান বলেন, গরম আর লোডশেডিংয়ের কথা না বলাই ভালো। দেশ যত উন্নয়নের আশা দেখাচ্ছে তত জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে। এখন ২৪ ঘণ্টায় ৫-৬ বার লোডশেডিং হচ্ছে। এক একবার লোডশেডিংয়ে দেড় থেকে ২ ঘণ্টা থাকছে। বৃহস্পতিবার দিনে ৩ বার ও রাতে ৩ বার লোডশেডিং হয়েছে। এই অবস্থায় বাসায় থাকা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এত বাজেট, এত উন্নয়ন দিয়ে কী হবে, যদি একটা দেশের রাজধানীতেই এভাবে লোডশেডিং হয়। আসলে বর্তমানে সবকিছু নিয়ে টিকে থাকাই একটা যুদ্ধ মনে হচ্ছে।
হেলাল শুভ থাকেন রাজধানীর শ্যামলীতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি লোডশেডিং প্রসঙ্গে। তিনি লিখেছেন, ‘রাত ১১টায় কারেন্ট গেছে, ২টায় একবার এলো, ৫ মিনিট পর আবার গেল। আধা ঘণ্টা পর আবার এলো। এর ৫ মিনিট পর আবার গেল। এভাবেই রাত পার। ঘেমে মেয়েটার ঠান্ডা লেগে গেছে। সব মিলিয়ে এক কঠিন যন্ত্রণার রাত ছিল আজকে। আমরা তো আবার কোনো রাগও দেখাতে পারব না। বললেই বলবেন যে বলছি
। কিন্তু যে উন্নয়নে মানুষ ঘুমাতেই পারে না, সেই উন্নয়ন দিয়ে আমরা কী করব।’
পুরান ঢাকার নয়াবাজারের আবদুর রাকিব বলেন, এমনিতেই গরম, তার ওপর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ কখন যায় আর আসে বলা কঠিন। রাতে লোডশেডিং হওয়ায় ঘুমানো যাচ্ছে না।
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, বৃহস্পতিবার চাহিদার বিপরীতে ৫৬০ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। শুক্রবার দুপুরে দেড় থেকে ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। বন্ধের দিন চাহিদা কম রয়েছে। সরবরাহ কম থাকলে রাতে লোড শেডিং হতে পারে। শিডিউল করে লোডশেডিং দেওয়ার বিষয়ে এখনও কিছু জানানো হয়নি।
ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী কাওসার আমির আলি বলেন, চাহিদা ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বৃহস্পতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করতে হয়েছে। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত দেড়শ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী মনে হচ্ছে শিডিউল করে লোডশেডিং দিতে হবে। শিডিউল করে দিতে পারলে ভালো হতো। এতে গ্রাহকের পূর্ব প্রস্তুতি থাকত। রোববার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব।
এ বিষয়ে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম বলেন, কয়লা সংকটে ২৫ মে বন্ধ হয়ে গেছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন কমানো হয়েছে। মজুদ কয়লা দিয়ে আরও ২ থেকে ৩ দিন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যেতে পারে। এরপর দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হব।
এতে লোডশেডিং বাড়বে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাড়ে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব তো কিছুটা পড়বেই। এই কেন্দ্রের কিছু বিদ্যুৎ ঢাকায়ও আসত। এতে ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব কিছুটা পড়তে পারে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করবে পিডিবি।
আবারও শিডিউল করে লোডশেডিং দেওয়ার বিষয়ে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাসুম আলম বকসী বলেন, এখন তো প্রতিদিনই হচ্ছে, আমাদের এখন যা শর্টেজ থাকে তা প্রতিটি জোনে ভাগ করে দেওয়া হয়। চাহিদার চেয়ে যা শর্টেজ থাকে সেই পরিমাণ লোডশেডিং করা হয়।
পায়রার বিকল্প হিসেবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন ছিল তখন রামপাল ও আদানি ছিল না। এখন বিকল্প তৈরি হয়েই আছে। এখন সমস্যা হচ্ছে অস্বাভাবিক গরমের কারণে লোডশেডিং বাড়ছে। পায়রা থাকলে ভালো হতো, এখন যে লোডশেডিং হচ্ছে সেটা করতে হতো না। এটা সাময়িক, চলতি মাসেই উৎপাদনে চলে আসবে। এলসি করা হয়েছে। কয়লা আসতে ২০ দিনের মতো লাগবে।
তিনি বলেন, এখন সবকিছুর দাম কমেছে, ডলার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। শিডিউল লোডশেডিংয়ে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন আমাদের এ রকম চিন্তা নেই। অস্বাভাবিক গরমের কারণেই এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
শিডিউল লোডশেডিংয়ে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদেশে অবস্থান করা বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব হাবিবুর রহমান পিডিবি পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, পায়রার বিকল্প হিসেবে ইতিমধ্যে খুলনার কম্বাইন্ড সাইকেলভিত্তিক ২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আদানি দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে, সেখান থেকেও কিছু বিদ্যুৎ পাচ্ছি। এই দুটি মিলিয়ে পায়রার বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পায়রা বন্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে চালু করতে পারব।
তিনি বলেন, প্রচ- গরমের কারণে এমনিতে যে চাহিদা থাকে তার চেয়ে আনুমানিক দেড় হাজার মেগাওয়াট চাহিদা বেশি আছে। ২৪ ঘণ্টাই এই বাড়তি চাহিদাটা থাকছে। আমরা চেষ্টা করছি কয়েকটা দিন এই চাহিদাটা ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে রাখার।
শিডিউল লোডশেডিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহেও তাপমাত্রা এমনই থাকলে তখন প্ল্যানড ওয়েতে লোডশেডিং করব। এখনও করা হয়, কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সরবরাহ ঠিক রাখতে হয়। এগুলো নিয়ে আমরা রোববার বসব। সুত্র:সময়ের আলো
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com