
অনলাইন ডেস্ক: আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আছে কি না এবং ভোট অনুষ্ঠান অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে কি না সে বিষয়ে মঙ্গলবার জানা-বোঝার চেষ্টা করে সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাথমিক পর্যবেক্ষক দল। তবে ইইউর এই ইলেকশন এক্সপ্লোরেটরি মিশন এ সম্পর্কে আরও একবার ইসির সঙ্গে বৈঠকে বসবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া দলটি মঙ্গলবার ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে ইইউর পর্যবেক্ষক দল মঙ্গলবার সকালে প্রায় ঘণ্টাখানেক বৈঠক করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। বৈঠক শেষে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ সাংবাদিকদের বলেন, ইইউর সঙ্গে নির্বাচন বিষয়ে কমিশনের বৈঠক হয়েছে। ইইউর দলটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে। আমাদের ভোটার, ভোটকেন্দ্র ও প্রস্তুতি এবং সিসি ক্যামেরাসহ তারা সব বিষয়েই জানতে চেয়েছে। নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করতে সক্ষম কি না সেসব বিষয় জানতে চেয়েছে। ইইউর জানতে চাওয়া সব বিষয়েই ব্যাখ্যা দিয়েছে ইসি। ব্যাখ্যায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে ইইউর দলটি।
অশোক কুমার দেবনাথ সাংবাদিকদের আরও বলেন, আমাদের এখন পর্যন্ত ৯১১টি নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো তাদের জানিয়েছি। তাতে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ভোটের পরিবেশ নিয়ে এখন পর্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করলেও ইইউর দলটি এ ইস্যুতে আবারও আলোচনা করবে। আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত তারা বাংলাদেশে অবস্থান করবে। ১৮ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে দলটি আবারও ইসির কারিগরি টিমের সঙ্গে বসে ভোটের পরিবেশ নিয়ে আরও আলোচনা করবে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনকালীন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটে আনার বিষয় নিয়ে ইইউর দলের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইইউর দলটি আমাদের প্রস্তুতির বিষয় এবং তাদের পর্যবেক্ষক পাঠানোর জন্য কী কী করতে হবে সেসব জানতে চেয়েছে। আমরা এ বিষয়ে তাদের বলেছি, পর্যবেক্ষক পাঠাতে হলে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন দিলে ভালো হয়। কারণ আরও কিছু ফরমালিটি রয়েছে। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্সের বিষয়ও রয়েছে। পর্যবেক্ষক পাঠাতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের কোনো লিমিটেশন নেই। তবে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক যত খুশি তত পাঠাতে পারবে তারা।
ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে সফররত ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান জ্যেষ্ঠ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ রিকার্ডো চিলেরি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন পূর্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দুই সপ্তাহের জন্য আমরা এখানে এসেছি। পর্যালোচনা শেষে ইইউর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জানাব। তারপর পর্যবেক্ষণ প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। আমাদের কোনো মিডিয়া প্রোফাইল নেই, তাই কোনো প্রশ্ন নিচ্ছি না।
সফররত ইইউ প্রাথমিক পর্যবেক্ষক দল মঙ্গলবার সকালে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকটি গুলশানের ইইউ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আবেদ আলী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। আমাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশে আগের নির্বাচনগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচন কেমন হবে সে সম্পর্কে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছে।
একই দিন দুপুরে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে ইইউ প্রাথমিক পর্যবেক্ষক দল। বৈঠকে অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ (এএম) আমিন উদ্দিন, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনীর, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদী হাছান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, ইইউর দলটি নির্বাচনি আইন বিষয়ে জানতে চেয়েছে এবং সেগুলো নিয়েই কথা বলেছে। নির্বাচনকালীন আরপিও আইন, ফৌজদারি আইন ও দেওয়ানি আইন এবং নাগরিকদের অধিকারের যে আইনগুলো আছে সেগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ আইনগুলো সম্পর্কেও জানতে চেয়েছে। আমরা সেগুলো সম্পর্কে তাদের বলেছি।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তা বোঝার জন্য ইইউর ৬ সদস্যের প্রাথমিক পর্যবেক্ষক দল গত রোববার থেকে বাংলাদেশে প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে। দলটি বাংলাদেশে দুই সপ্তাহ অবস্থান করবে। এরই মধ্যে তারা আসন্ন নির্বাচন বিষয়ে বিদেশি একাধিক রাষ্ট্রদূত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় ও আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপ-কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছে। দলটি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে আসন্ন ভোটের পরিবেশ-পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করবে। দুই সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ শেষে ইইউর প্রাথমিক দল তাদের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলের কাছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দেবে। ওই প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলেই পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে পাঠাবে ইইউ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি সময়ের আলোকে বলেন, ইইউর এ দলটি প্রাথমিক পর্যায়ের, এরপর আরও দুটি দল আসবে। তবে প্রাথমিক দলটি আসন্ন ভোট অনুষ্ঠান নিয়ে সন্তোষজনক প্রতিবেদন দিলেই পরবর্তী এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণে চূড়ান্ত মিশন পাঠাবে ইইউ। ইইউর নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত এ মিশনগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলের কাছে তারা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।
তিনি বলেন, সবশেষ ২০০৭-০৮ সালের ভোটে ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনে মোট ১৪০ জন সদস্য ছিল। বাংলাদেশের ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ আমাদের দুই পক্ষের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তা প্রভাব ফেলবে।
Leave a Reply