
অনলাইন ডেস্ক: প্রথম শ্রেণিতে যে সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তার মধ্যে মাত্র ৫৫ ভাগ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করে। বাকিরা দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে লেখাপড়া থেকে ছিটকে পড়ে।
মাধ্যমিকের (এসএসসি) গণ্ডি পেরোনার আগেই ঝরে পড়ে অর্ধেক শিক্ষার্থী। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে ২০১৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও ইবতেদায়ি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪০ জন শিক্ষার্থী।
স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারলে তাদেরই এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা ছিল। কিন্তু এবার যারা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বসতে পারছে, তাদের সংখ্যা ১৩ লাখ ৫৯ হাজারের সামান্য বেশি। অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সাত বছরের শ্রেণি কার্যক্রমে প্রায় ১৭ লাখ বা ৫৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার স্বাভাবিক পথ থেকে ছিটকে পড়েছে। অতিমারি করোনায় ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, ঝরে পড়াদের মধ্যে অধিকাংশই মেয়ে শিক্ষার্থী। করোনার অভিঘাত লেখাপড়ায় ছেদ পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ। জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন শিক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝরে পড়া মেয়ে শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার পেছনে অল্প বয়সে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাকেও দুষছেন তারা। এ ছাড়া শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে গ্রামের শিক্ষার্থীরা বেশি ঝরে পড়েছে। করোনাকালে ভার্চুয়ালের মাধ্যমে লেখাপড়া অব্যাহত রাখার পরও সবার লেখাপড়ার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই যাদের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আছে তারা নিবন্ধিত হওয়ার পরও পরীক্ষায় বসছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিকূল অবস্থাসহ সবসময় ঝরে পড়ার ওপর প্রভাব ফেলে। আগামীতে হয়তো পরীক্ষায় বিরত থাকা শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় ফিরে আসবে। তখন পরীক্ষার্থী বেশি পাওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করছেন তারা।
২০১৭ সালে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনীর জন্য আবেদন করেছিল ৩০ লাখ ৯৬ হাজার ৭৫ জন শিক্ষার্থী। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেয় ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৬১৫ জন। তাদের মধ্যে ২৮ লাখ ২ হাজার ৭১৫ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছিল। ওই বছর প্রাথমিক সমাপনী দেওয়া শিক্ষার্থীদেরই এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০ লাখ ৪১ হাজার ৪৫০ জন শিক্ষার্থী এ বছর এসএসসি ও সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ জন। অর্থাৎ আরও ৪ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গ-ি পার হতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদেরই একজন রংপুরের মাহমুদা মনি। দুই সমাপনী শেষ করা মাহমুদা মনি তখন ভাবতেও পারেননি, দশম শ্রেণিতে উঠেই তার শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাবে, হার মানতে হবে দারিদ্র্যের কাছে।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক কাজী ফারুক হোসেন বলেন, আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী করোনাকালে লেখাপড়া ছেড়ে দেবে। এর ফলে শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তাদের প্রণোদনার অংশ হিসেবে উপবৃত্তি দেওয়া হয়।
মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার চিত্র তুলে ধরতে এবারের এসএসসিতে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় নিবন্ধিত করা ৫৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ঝরে পড়াদের মধ্যে অধিকাংশই মেয়ে শিক্ষার্থী, সংখ্যায় ৩২ হাজারের বেশি। তারা বেশিরভাগই বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর জেলা নিয়ে গঠিত এই শিক্ষা বোর্ড থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার অংশ নিতে কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে মোট নিবন্ধন করে ২ লাখ ৩১ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে এ বছরের এসএসসিতে অংশ নিচ্ছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮৯ জন শিক্ষার্থী। আগের বছর ২০২২ সালের এসএসসিতে অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৩ জন। নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল ২ লাখ ২০ হাজার ২৮৮ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ঝরে পড়েছিল ৩৬ হাজার ৯৪৫ জন পরীক্ষার্থী।
এ বিষয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান জানান, করোনা মহামারির পর একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকেই দেখা গেছে অষ্টম শ্রেণি পাশের সনদ দিয়ে কোনো না কোনো চাকরি খুঁজছেন। যে কারণে অনেকে রেজিস্ট্রেশন করলেও পরীক্ষায় বসছে না। ছেলেদের ক্ষেত্রে বিদেশ চলে যাওয়ার একটা প্রবণতা আছে। আর মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে বাল্যবিয়ে। এ ছাড়া পারিবারিক কারণে দেশের মধ্যেই চাকরির খোঁজ করার আগ্রহ তৈরি হওয়ায় এমন হয়েছে। তবে নিবন্ধন করেও ফরম পূরণ না করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবাই যে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়েছে বিষয়টি এমন নয় বলে জানান তিনি।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থী বেড়েছে। সব মিলিয়ে অর্ধ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী বেড়েছে। করোনাকালে শিক্ষায় কিছুটা ছন্দপতন হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বলছে, শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply