
অনলাইন ডেস্ক: ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বর্ষণে ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্ট তিস্তার পানি আবারও বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। পানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
শুক্রবার বিকাল ৩টায় ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর আগে দুপুর ১২টায় পানি বিপদসীমা ৬ সেন্টিমিটার বরাবর প্রবাহিত হচ্ছিল।
তিস্তায় পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার কয়েকটি চরের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিস্তার উৎস মুখ ঝাড়সিংহেশ্বরের চরাঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন-টেপাখড়িবাড়ি, পূর্বছাতনাই, খালিশাচাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ি, খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের ১৫টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। টেপা খড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন বলেন, আমার ইউনিয়নে বেশ কয়টি চর আছে চরাঞ্চলের লোকদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। তাদের পুনর্বাসনের জন্য ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাদের শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
খালিসা চাপানি ইউনিয়নের রুস্তম আলী বলেন, পানি বাড়য় বাইশপুকুর ও ভেন্ডাবাড়ি গ্রামে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। বন্যার পানিতে যেকোনো সময় বসতবাড়ি তলিয়ে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।
ডালিয়া পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, শুক্রবার উজানের ঢলে তিস্তা নদীতে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। সকাল ৯টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমা বরাবর প্রবাহিত হয়। এরপর পানি বেড়ে দুপুর ১২টায় বিপদসীমার ৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার তিন সেন্টিমিটার নিচে ছিল। বেলা ৩টায় তিস্তা ব্যারেজের দোয়ানী পয়েন্টে নদীর পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ২৬ সেন্টিমিটার (স্বাভাবিক প্রবাহ ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার)। অর্থাৎ ওই বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদৌলা জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে তিস্তা অববাহিকার বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সংলগ্ন লালমনিরহাট পাঁচ উপজেলার নদী-তীরবর্তী বাসিন্দারা ফের বন্যার আতঙ্কে রয়েছে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বিকালে বলেন, তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে মধ্যরাত নাগাদ পানি আরও বাড়তে পারে এবং সর্বোচ্চ বিপদসীমার ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার ওপর পর্যন্ত যেতে পারে। তিনি বলেন, সাধারণত পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপরে গেলেই তিস্তার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে যায়। সেখানে ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার ওপরে চলে গেলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে কাউনিয়া পয়েন্টেও তিস্তার পানি বিপদসীমা ছুঁয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওই নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণ উজানের ভারী বৃষ্টি। শিলিগুড়ি, দার্জিলিংয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই পানি তিস্তার দিকে আসছে।
পাউবোর ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপ কর্মচারী নুরুল ইসলাম বলেন, সকাল ৯টা থেকে নদীতে পানি বাড়তে শুরু করে। দুপুর ১২টার পর পানি বিপদসীমার তিন সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে; যা বিকালে বৃদ্ধি পেয়ে ১১ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এদিকে পানি বাড়তে থাকায় নদী-তীরবর্তী এলাকা ও নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করে। এতে লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলার তিন থেকে চার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ও খুনিয়াগাছ বাগডোরা; আদিতমারী
উপজেলার খুনিয়াগাছ ও কালমাটি এবং হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না গড্ডিমারি এলাকায় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক শ্যামল বলেন, এ ইউনিয়নের ছয়টি ওয়ার্ড তিস্তা পাড়ে অবস্থিত। সকাল থেকে পানি বাড়ায় বন্যার আতঙ্কে আছে এলাকার লোকজন।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী বলেন, মহিষখোচা ইউনিয়নের সাতটি ওয়ার্ড নদী এলাকায়। বন্যা হলে এসব এলাকার বাসিন্দারা দুর্ভোগে পড়েন। এ মাসেই একবার বন্যা হয়েছে। সেই ক্ষতই শুকায়নি। আবারও নদীর পানি বাড়ছে। তাই নদী খনন করে দুই তীরে বাঁধ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্যাহ বলেন, শুনেছি, পানি বাড়ছে। তবে বন্যা মোকাবিলায় সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া আছে আমাদের। নদীতীরের মানুষ সতর্ক করা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানায়, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি সমতলও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানি সমতলে কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
এ ছাড়া আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, আপার করতোয়া, আপার আত্রাই, কুলিখ, টাঙ্গন, পুনর্ভবা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, সোমেশ^রী, যাদুকাটা, ভুগাই-কংশ, সারিগোয়াইন নদীর পানি সমতল সময়বিশেষে বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও জানানো হয়।
এদিকে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। মঙ্গলবার রাতে চর মুকুন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আংশিক চলে গেছে নদীগর্ভে। যেকোনো সময় বাকি অংশটুকুও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
ওই এলাকার মহিলা মেম্বার মমতাজ বেগম জানান, প্রতি বছর পদ্মার ভাঙনে অত্র ইউনিয়নের লোকজন দিশাহারা। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।
পদ্মার ভাঙনে বাড়ি হারানো সিদ্দিকুর রহমান (৬০) বলেন, সাত বছর আগে এখানে বাড়ি করে ১ ছেলে ২ মেয়ে নিয়ে বসবাস করছিলাম। হঠাৎ রাতের বেলায় ২ ঘণ্টার মধ্যে বাড়িঘর পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। এখন আমি অন্যের বাড়ির বারান্দায় আছি।
ধুলশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জায়েদ খান বলেন, পদ্মার ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুলসহ অর্ধশতাধিক বাড়িঘর। গত সোমবার রাত ৯টার দিকে ধুলশুড়া ইউনিয়নের আবিধারা ও ইসলামপুর এলাকায় ভাঙনে নিঃস্ব হয়েছে ১২টি পরিবার। আর মঙ্গলবার রাত ২টায় ৪৬নং চর মকুন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আংশিক ধসে গেছে নদীতে।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তাপসী রাবেয়া বলেন, মঙ্গলবার রাতে স্কুলের আংশিক পদ্মায় ধসে গেছে। আমি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনরোধে কাজ করছে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দীন বলেন, আপদকালীন সময়ে ১২০০ মিটার এলাকায় কাজ চলছে। হঠাৎই সোমবার রাতে কয়েকটি বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মঙ্গলবার রাতে একটি স্কুলের আংশিক ধসে গেছে। বৃষ্টির মধ্যেও আমাদের লোকজন জিও ব্যাগের পাশাপাশি, জিও টিউব ডাম্পিং করছে। বাড়িঘরগুলো রক্ষা করতে আমরা কাজ করছি। আশা করি ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।
Leave a Reply