
অনলাইন ডেস্ক: রেল যোগাযোগ স্থাপন ছিল কক্সবাজারবাসীর জন্য স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শনিবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রধানমন্ত্রী আসছেন কক্সবাজার। তিনি উদ্বোধন করবেন ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ১৫৪ কিলোমিটার। সড়কপথে বাসে যেতে সময় লাগে ৫ ঘণ্টা। মহাসড়কে যানজটে পড়লে ৬-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। দোহাজারি-কক্সবাজার রেলপথ চালু হলে ৬-৭ ঘণ্টার এ দূরত্ব নেমে আসবে অর্ধেকে। কমবে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসার পাশাপাশি সুযোগ সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের।
স্বপ্নের এই রেললাইনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে উদ্বোধন করবেন ৫৩ হাজার কোটি টাকার আরও ১৬টি প্রকল্প।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান জানান, রেললাইন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী যে ১৬টি প্রকল্প উদ্বোধন করবেন তাতে রয়েছে-বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্মিত মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযুক্তি প্রকল্প। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাটে ৫৯৫ মিটার পিসি বক্স গার্ডার ব্রিজ, কক্সবাজার সদরে খাল লাইনিং এপ্রোচ রোড ও ব্রিজ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ৪টি প্রকল্প, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪টি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ১টি প্রকল্প। এ ছাড়াও রয়েছে জনস্বাস্থ্য, গণপূর্ত এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়নাধীন ৩টি প্রকল্প।
মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র : সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর অন্যতম মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি জাপানের আর্থিক সহায়তায় ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু হয় ২৯ জুলাই। ৬ মেগাওয়াটের পরীক্ষামূলক উৎপাদনের কার্যক্রম শুরুর পর এটি ১২ মেগাওয়াট উৎপাদন শুরু করে অক্টোবরের শুরুতে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনোওয়ার হোসেন মজুমদার জানান, উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, মহেশখালী উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নের মাঝামাঝি স্থানে ১ হাজার ৬০৮ একর জমির ওপর স্থাপিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি ইউনিটে বিভক্ত। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিএল) বাস্তবায়ন করছে।
প্রকৌশলী মনোওয়ার হোসেন আরও জানান, ২০১৪ সালে অনুমোদন পাওয়া মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল পাওয়ার প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। পরে সংশোধন করে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা) এই প্রকল্পের জন্য ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই অর্থ বৃদ্ধি করে জাইকা মোট ৪৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা দিয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করেছে।
সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে কুতুবদিয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযুক্ত প্রকল্প : কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযুক্ত হয়েছে। সমুদ্রের নিচ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে কুতুবদিয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় গত ১৩ এপ্রিল। ওই দিন থেকে দ্বীপটির দেড় হাজার গ্রাহক পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ সুবিধা পেতে শুরু করে।
প্রকল্পটির পরিচালক ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ফারুক আহমেদ জানান, কুতুবদিয়া দ্বীপে ১৯৮০ সাল থেকে জেনারেটরের মাধ্যমে সান্ধ্যকালীন কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে দেড় হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়েছে। দ্বীপের ২০ হাজার গ্রাহককে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে।
বাঁকখালী নদীতে ৫৯৬ মিটার পিসি বক্স গার্ডার ব্রিজ : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খান জানান, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কস্তুরাঘাট সংলগ্ন বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে ‘কক্সবাজার-খুরুশকুল’ সংযোগ সেতু। এটি হচ্ছে বক্স গার্ডার সেতু। তিনি জানান, ৫৯৬ মিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা। সেতুটির আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ২০২১ সালের আগস্টের মধ্যে এটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারিসহ নানা জটিলতায় কাজ শেষ হতে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময় লেগেছে।
তিনি জানান, এই সেতুটি নির্মাণের ফলে পর্যটন শিল্প খাতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কক্সবাজার শহরকে সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কক্সবাজার শহরের উত্তর দিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সেখানে যারা জমি দিয়েছে তাদের ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারকে খুরুশকুল প্রান্তে আবাসন ব্যবস্থা করে দিচ্ছে সরকার। তাদের যাতায়াতে এই সেতুটি ব্যবহৃত হবে। এ ছাড়াও এই সেতুটি নির্মাণের ফলে চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের দূরত্ব অনেক কমে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী এ ছাড়াও উদ্বোধন করবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার সদরে খাল লাইনিং এপ্রোচ রোড ও ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ৪টি প্রকল্প। যেখানে রয়েছে ৪ কোটি টাকায় নির্মিত কুতুবদিয়ার কৈয়ারবিল ঠান্ডা চৌকিদার পাড়ার ৬০ মিটার সিসি গার্ডার ব্রিজ, ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চকরিয়া বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণ প্রকল্প, উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প এবং ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীতে গোরকঘাটা-জনতা বাজার সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প।
প্রধানমন্ত্রী আজ আরও যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪টি প্রকল্প-৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার সদরের জাহারা ইসলাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, ২ কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীর ইউনুসখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উখিয়ার রত্নাপালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও মারিচ্যা পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৫ কোটি টাকায় বাস্তবায়ন করা রামু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজেরও আজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়াও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা রয়েছে ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে টেকনাফ মাল্টিপারপাস ডিজাস্টার শেল্টার কাম আইসোলেশন সেন্টার, রামুর নন্দাখালীতে ১৮৪ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কাব স্কাউটিং সম্প্রসারণ প্রকল্প।
গতকাল শুক্রবার সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার শহর থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্বে ঝিলংজা ইউনিয়নের হাজীপাড়া এলাকায় ২৯ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে আইকনিক রেলস্টেশন। ঝিনুকের আদলে তৈরি দৃষ্টিনন্দন এ স্টেশন ভবনটির আয়তন ১ লাখ ৮২ হাজার বর্গফুট। ছয় তলা ভবনটির কাজ প্রায় শেষ। স্টেশনটিতে আবাসিক হোটেলের পাশাপাশি ক্যান্টিন, লকার, গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। পর্যটকরা স্টেশনের লকারে লাগেজ রেখে সারা দিন সমুদ্রসৈকতে বা দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যেতে পারবে। এ স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন ৪৬ হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করতে পারবে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, রেল চালু হলে পর্যটক যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি স্বল্প সময়ে ও কম খরচে কৃষিপণ্য, মাছ, লবণ পরিবহন করা যাবে। এতে কক্সবাজারের পর্যটনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টির কারণে পুরো কক্সবাজারের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে গেছে। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply